কঙ্কাবতী - Konkaboti by Troilokyanath Mukhopadhyay, chapter name প্রথম খণ্ড - পঞ্চম পরিচ্ছেদ

প্রথম খণ্ড - পঞ্চম পরিচ্ছেদ

বালক-বালিকা

বাড়ী যাইবার দিন নিকট হইল। এখানে খেতুর মনে, আর সেখানে মার মনে আনন্দ আর ধরে না। তসর ও গালার ব্যবসায়ীরা সকলে এখন দেশে যাইতেছিল। তাহাদের সহিত রামহরি খেতুকে পাঠাইয়া দিলেন, আর কবে কোন্ সময় দেশে পৌঁছিবে, সে সমাচার আগে থাকিতে খেতুর মাকে লিখিলেন।  

দত্তদের পুকুরধারে কেন, খেতুর মা আরও অনেক দূরে গিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। দূর হইতে খেতু মাকে দেখিতে পাইয়া ছুটিয়া গিয়া তাহাকে ধরিল। খেতুর মা ছেলেকে বুকে করিয়া স্বর্গসুখ লাভ করিলেন।

খেতু বলিল, “ওই যা! মা, আমি তোমাকে প্রণাম করিতে ভুলিয়া গিয়াছি।”মা উত্তর করিলেন, “থাক্, আর প্রণামে কাজ নাই। অমনি তোমাকে আশীর্বাদ করি তুমি চিরজীবী হও, তোমার সোনার দোয়াত-কলম হউক্।”

খেতু বলিল, “মা, আমি মনে করিয়াছিলাম, তুমি দত্তদের পুকুরধারে থাকিবে, এত দূরে আসিবে তাহা জানিতাম না।”

মা বলিলেন, “বাছা, যদি উপায় থাকিত, তো আমি কলিকাতা পর্যন্ত যাইতাম। খেতু, তুমি রোগা হইয়া গিয়াছ।”

খেতু উত্তর করিল, “না মা, রোগা হই নাই, পথে একটু কষ্ট হইয়াছে তাই রোগা রোগা দেখাইতেছে”।পরদিন খেতু দেখিল যে তাহাদের বাটিতে কোথা হইতে একটি ছোট মেয়ে আসিয়াছে।

খেতু জিজ্ঞাসা করিল, মা, ও মেয়েটি কাদের গো?”

মা বলিলেন, “জান না? ও যে তোমার তনু কাকার ছোট মেয়ে। ওর নাম কঙ্কাবতী।” তনু রায়ের স্ত্রী এখন সর্বদাই আমার নিকট আসেন। আমি পইতা কাটি, আর দুই জনে বসিয়া গল্প করি। মেয়েটিকে তিনি আমার কাছে মাঝে মাঝে ছাড়িয়া যান। মেয়েটি আপনার মনে খেলা করে কোনও রূপ উপদ্রব করে না। আমার কাছে থাকিতে ভালবাসে।তনু রায়ের সহিত খেতুর কোনও সম্পর্ক নাই, কেবল পাড়া-প্রতিবেশী, সুবাদে কাকা কাকা করিয়া ডাকে।

কঙ্কাবতীকে খেতু বলিল, “এস, এই দিকে এস।”

কঙ্কাবতী সেই দিকে যাইতে লাগিল। খেতু বলিল “দেখ দেখ মা, এ কেমন টল্ টল্ করিয়া চলে”।

খেতুর মা বলিলেন, ‘পা এখনও শক্ত হয় নাই।”

একটি পাতা দেখাইয়া খেতু বলিল, “এই নাও।”পাতাটি লইবার নিমিত্ত কঙ্কাবতী হাত বাড়াইল ও হাসিল।

খেতু বলিল, “মা, কেমন হাসে দেখ।”

মা উত্তর করিলেন, “হাঁ বাছা, মেয়েটি খুব হাসে, কাঁদিতে একেবারে জানে না, অতি শান্ত”।

খেতু বলিল, “মা, আগে যদি জানিতাম, তো ইহার জন্য একটি পুতুল কিনিয়া আনিতাম”।

মা বলিলেন, “এইবার যখন আসিবে, তখন আনিও।”পূজার ছুটি ফুরাইলে খেতু কলিকাতায় চলিয়া গেল। সেখানে অতি মনোযোগের সহিত লেখাপড়া করিতে লাগিল। বৎসরের মধ্যে দুইবার ছুটি হইলে সে বাটি আসে। সেই সময় মার জন্য কোনও না কোনও দ্রব্য, আর কঙ্কাবতীর জন্য পুতুলটি খেলনাটি লইয়া আসে। খেতুর মার নিকট কঙ্কাবতী সর্বদাই থাকে, কঙ্কাবতীকে তিনি বড় ভালবাসেন।

খেতুর যখন বার বৎসর বয়স, তখন সে একটি বড়মানুষের ছেলেকে পড়াইতে লাগিল। বালকের পিতা খেতুকে মাসে পাঁচ টাকা করিয়া দিতেন।প্রথম মাসের টাকা কয়টি, খেতু রামহরির হাতে দিয়া বলিল, “দাদা মহাশয়। এ মাস হইতে মার চাউলের দাম আর আপনি দিবেন না, এই টাকা মাকে দিবেন। আমি শুনিয়াছি, আপনার ধার হইয়াছে তাই যত্ন করিয়া আমি এই টাকা উপার্জন করিয়াছি।”

রামহরি বলিলেন, “খেতু, তুমি উত্তম করিয়াছ। উদ্যম, উৎসাহ, পৌরুষ মনুষ্যের নিতান্ত প্রয়োজন। এ টাকা আমি তোমার মার নিকট পাঠাইয়া দিব। তাঁহাকে লিখিব যে, তুমি নিজে এ টাকা উপার্জন করিয়াছ। আর আমি সকলকে বলিব যে, দ্বাদশ বৎসরের শিশু আমাদের খেতু, তাহার মাকে প্রতিপালন করিতেছে।”এইবার যখন খেতু বাটি আসিল, তখন মার জন্য একখানি নামাবলী, আর কঙ্কাবতীর জন্য একখানি রাঙা কাপড় আনিল। রাঙা কাপড়খানি পাইয়া কঙ্কাবতীর আর আহ্লাদ ধরে না। ছুটিয়া তাহার মাকে দেখাইতে গেল।

খেতু বলিল, “মা, কঙ্কাবতীকে লেখাপড়া শিখাইলে হয় না?”

মা বলিলেন, “কি জানি বাছা তনু রায় এক প্রকারের লোক। কি বলিতে কি বলিয়া বসিবে।”

খেতু বলিল, “তাহাতে আর দোষ কি, মা? কলিকাতায় কত মেয়ে স্কুলে যায়।”

মা বলিলেন, “কঙ্কাবতীর মাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিব”।সেই দিন তনু রায়ের স্ত্রী আসিলে, খেতুর মা কথায় কথায় বলিলেন, “খেতু বলিতেছে, এবার যখন বাটী আসিব, তখন কঙ্কাবতীর জন্য একখানি বই আনিব, কঙ্কাবতীকে একটু একটু পড়িতে শিখাইব। আমি বলিলাম না বাছা। তাতে আর কাজ নাই, তোমার তনু কাকা হয় তো রাগ করিবেন”।

তনু রায়ের স্ত্রী উত্তর করিলেন, “তাহাতে আবার রাগ কি? আজকাল তো ওই সব হইয়াছে। জামা গায়ে দেওয়া, লেখা পড়া করা, আজকাল তো সকল মেয়েই করে। তবে আমাদের পাড়াগাঁ, তাই এখানে ও-সব নাই।

বাটি গিয়া কঙ্কাবতীর মা স্বামীকে বলিলেন, “খেতু বাড়ী আসিয়াছে। কঙ্কাবতীর জন্য কেমন একখানি রাঙা কাপড় আনিয়াছে”।তনু রায় বলিলেন, “খেতু ছেলেটি ভাল। লেখাপড়ায় মন আছে। দুই-পয়সা আনিয়া খাইতে পারিবে। তবে বাপের মতো ডোকলা না হয়।”

স্ত্রী বলিলেন, “খেতু বলিতেছিল যে, এইবার যখন বাটি আসিব, তখন একখানি বই আনিয়া কঙ্কাবতীকে একটু একটু পড়িতে শিখাইব।”

তনু রায় বলিলেন, “আচ্ছা, খেতু যদি কঙ্কাবতীকে একটু আধটু পড়িতে শিখায়, তাহাতে আমার বিশেষ কোনও আপত্তি নাই।তনু রায়ের স্ত্রী সেই কথা খেতুর মাকে বলিলেন। খেতুর মা সেই কথা খেতুকে বলিলেন। এবার যখন খেতু বাটি আসিল, তখন কঙ্কাবতীর জন্য একখানি প্রথমভাগ বর্ণপরিচয় আনিল। লেখাপড়া শিখিব, এই কথা মনে করিয়া প্রথম প্রথম কঙ্কাবতীর খুব আহ্লাদ হইল। কিন্তু দুই চারি দিন পরেই সে জানিতে পারিল যে, লেখাপড়া শিক্ষা করা নিতান্ত আমোদের কথা নহে। কঙ্কাবতীর চক্ষে অক্ষরগুলি সব এক প্রকার দেখায়। কঙ্কাবতী এটি বলিতে সেটি বলিয়া ফেলে।

খেতুর রাগ হইল। খেতু বলিল, “কঙ্কাবতী, তোমার লেখাপড়া হইবে না। চিরকাল মূর্খ হইয়া থাকিবে।”কঙ্কাবতী অভিমানে কাঁদিয়া ফেলিল। সে বলিল, “আমি কি করিব, আমার যে মনে থাকে না।”

খেতুর মা বলিলেন, “ছেলেমানুষকে কি বকিতে আছে? মিষ্ট কথা বলিয়া শিখাইতে হয়। আইস মা, তুমি আমার কাছে আইস, তোমার আর লেখাপড়া শিখিতে হইবে না।”

   

খেতু বলিল, “মা, কঙ্কাবতী রাত্রি দিন মেনিকে লইয়া থাকে। তাহাতে কি আর লেখাপড়া হয়?”

মেনি কঙ্কাবতীর বিড়াল। অতি আদরের ধন মেনি।কঙ্কাবতী বলিল, “জেঠাইমা। আমি মেনিকে ক খ শিখাই, তা আমিও যেমন বোকা, মেনিও তেমনি বোকা। কেমন মেনি, না? মেনিও পড়িতে পারেনা, আমিও পড়িতে পারি না। আমিও ছেলে মানুষ, মেনিও ছেলেমানুষ। আমিও বড় হইলে পড়িতে শিখিব, মেনিও বড় হইলে পড়িতে শিখিবে। না, মেনি?”

খেতু হাসিয়া উঠিল।

যাহা হউক, ক্রম কঙ্কাবতীর প্রথমভাগ বর্ণ-পরিচয় সায় হইল। খেতু বলিল, “আমি শীঘ্র কলিকাতায় যাইব। তাড়াতাড়ি করিয়া প্রথমভাগখানি শেষ করিলাম, কিন্তু ভাল করিয়া হইলনা। এই কয় মাসে পুস্তকখানি একবারে মুখস্থ করিয়া রাখিবে। এবার আমি দ্বিতীয়ভাগ লইয়া আসিব।পুনরায় যখন খেতু বাটি আসিল, তখন কঙ্কাবতীর দ্বিতীয়ভাগ শেষ হইল। কঙ্কাবতীকে আর পড়াইতে হইল না। কঙ্কাবতী এখন আপনা-আপনি সব পড়িতে শিখিল। খেতু কঙ্কাবতীকে একখানি পাটিগণিত দিয়াছিল। তাহা দেখিয়া কঙ্কাবতী অঙ্ক শিখিল। মাঝে মাঝে খেতু কেবল একটু আধটু বলিয়া দিত।

কঙ্কাবতী পড়িতে বড় ভালবাসিত। কলিকাতা হইতে খেতু তাহাকে নানা পুস্তক ও সংবাদপত্র পাঠাইয়া দিত। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনগুলি পর্যন্ত কঙ্কাবতী পড়িত।রামহরির কন্যা সীতার এখন সাত বৎসর বয়স। মা একেলা থাকেন, সেইজন্য দাদাকে বলিয়া, খেতু সীতাকে মার নিকট পাঠাইয়া দিল। সীতাকে পাইয়া খেতুর মার আর আনন্দের অবধি নাই

কঙ্কাবতীও সীতাকে খুব ভালবাসিত। বৈকাল বেলা দুইজনে গিয়া বাগানে বসিত। কঙ্কাবতী এখন খেতুর সম্মুখে বড় বাহির হয় না। খেতুকে দেখিলে কঙ্কাবতীর এখন লজ্জা করে।তবে খেতুর গল্প করিতে, খেতুর গল্প শুনিতে সে ভালবাসে। অন্য লোকের সহিত খেতুর গল্প করিতে, কিংবা অন্য লোকের মুখে খেতুর কথা শুনিতে, তাহার লজ্জা করিত। এসব কথা সীতার সহিত হইত। বৈকাল বেলা দুইজনে ফুলের বাগানে যাইত। নানা ফুলে মালা গাঁথিয়া কঙ্কাবতী সীতাকে সাজাইত। ফুল দিয়া নানারূপ গহনা গড়িত। গলায়, হাতে, মাথায়, যেখানে যাহা ধরিত, কঙ্কাবতী সীতাকে ফুলের গহনা পরাইত। তাহার পর সীতার মুখ হইতে বসিয়া বসিয়া খেতুর কথা শুনিত।