ফাউণ্ডেশন অ্যাণ্ড এম্পায়ার by আইজাক আসিমভ, chapter name দ্বিতীয় পর্ব : দ্য মিউল - ১৪. দ্য মিউট্যান্ট

দ্বিতীয় পর্ব : দ্য মিউল - ১৪. দ্য মিউট্যান্ট

কালগানের “হ্যাঙ্গার” একটু অদ্ভুত ধরনের। পর্যটকদের সাথে এখানে বিপুলসংখ্যক মহাকাশযানের আগমন ঘটে, সেগুলোর থাকার জায়গা করে দেওয়ার জন্যই এটা তৈরি হয়েছে। বুদ্ধিটা প্রথম যার মাথায় আসে, অল্প কয়েকদিনেই সে মিলিয়নেয়ারে পরিণত হয়। তার বংশধরেরা-জন্মসূত্রে বা অর্থের জোরে, যেভাবেই হোক- পরিণত । হয় কালগানের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে।

এক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত “হ্যাঙ্গার” এবং শুধু “হ্যাঙ্গার” বললে সবটুকু পরিষ্কার হবে না। প্রকৃতপক্ষে এটা একটা হোটেল-মহাকাশযানের জন্য। নির্দিষ্ট ফি প্রদান করলে ভ্রমণকারীদের মহাকাশযানের জন্য একটা বার্থ বরাদ্দ করা হয়, যেখান থেকে তারা যে-কোনো মুহূর্তে টেক অফ করতে পারে। সাধারণ হোটেল সেবা যেমন ভালো খাবার, ওষুধপত্তর, শহরে বেড়ানোর ব্যবস্থা সবই নির্দিষ্ট ফি এর বিনিময়ে এখানে পাওয়া যাবে।

ফলে পর্যটকরা একই সাথে হ্যাঁঙ্গার এবং হোটেল সেবা পেয়ে যাচ্ছে অল্প খরচে। মালিক তার গ্রাউণ্ড সাময়িক ভাড়া দিয়ে অর্জন করছে প্রচুর মুনাফা। সরকার সংগ্রহ করছে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স। কারো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। সবাই খুশি। সোজা ব্যাপার।

প্রশস্ত কয়েকটা করিডর হ্যাঁঙ্গারের অগণিত ডানাগুলোকে যুক্ত করেছে। প্রতিটা ডানায় জায়গা পেয়েছে শতাধিক মহাকাশযান। আধো অন্ধকারে ঢাকা প্রশস্ত করিডর ধরে যে লোকটা হেঁটে যাচ্ছে, এর আগেও সে উপরে বর্ণিত সুযোগ সুবিধা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছে, কিন্তু তা ছিল অলস সময় কাটানোর উপায় কিন্তু এখন এত ভাবার সময় নেই।

বেঢপ উচ্চতার জাহাজগুলো সারিবদ্ধভাবে তৈরি করা প্রকোষ্ঠে আড়াআড়িভাবে শুয়ে আছে। একটার পর একটা লাইন পেরিয়ে যাচ্ছে লোকটা। নিজের কাজে সে দক্ষ-হ্যাঙ্গারে রেজিস্ট্রি করা সম্বন্ধে যে তথ্য সে সংগ্রহ করেছে সেগুলো সাহায্য না করলেও নিজের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষ জ্ঞানের সাহায্যে সে নির্দিষ্ট ডানা এবং শত শত মহাকাশযানের ভেতর থেকে নির্দিষ্ট শিপ ঠিকই খুঁজে নিতে পারবে।

দু-একটা পোর্টহোলে আলো দেখা যাচ্ছে, তার মানে উঁচুমানের বিনোদন ছেড়ে সাধারণ বিনোদনের জন্য-অথবা নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য কেউ কেউ ফিরে এসেছে। লোকটা থেমে দাঁড়াল, হাসতে জানলে হয়তো হাসত। তবে তার মস্তিষ্কের উদ্দীপনাকে হাসির সমকক্ষ বলা যায়।

যে মহাকাশযানের সামনে সে থেমেছে সেটা চকচকে মসৃণ। নিঃসন্দেহে দ্রুতগতির। আলাদা ডিজাইনের, এটাই খুঁজছিল। মডেলটা আলাদা-এবং বর্তমানে গ্যালাক্সির এই পরিধির সকল মহাকাশযান ফাউণ্ডেশন-এর নকল করে বা ফাউণ্ডেশন-এর কারিগরদের দ্বারা তৈরি করা হয়। কিন্তু এটা খোদ ফাউণ্ডেশনে তৈরি করা হয়েছে। তার প্রমাণ ইস্পাতের চামড়ায় ছোট ঘোট বুদবুদ, নিরাপত্তা স্ক্রিণের সংযোগস্থল হিসেবে এগুলো কাজ করে। এবং একমাত্র ফাউণ্ডেশন শিপেই এধরনের নিরাপত্তা স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়।

লোকটা একটুও ইতস্তত করল না।

বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। সাথে করে আনা বিশেষ ধরনের নিউট্রালাইজিং ফোর্স এর সাহায্যে এলার্ম অ্যাকটিভেট না করেই সে খুব সহজে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।

কেউ এসেছে কোমল সুরে বাজার বেজে উঠার পরেই শুধুমাত্র ভেতরের মানুষগুলো তা টের পেল। মেইন এয়ারলকের পাশে একটা ফটোসেল আছে, সেটাতে হাতের তালু দিয়ে স্পর্শ করলে বাজার বেজে ওঠে।

তার আগে “বেইটার” ধাতব দেয়ালের ভেতরে টোরান এবং বেইটা নিশ্চিন্তে সময় কাটাচ্ছিল। মিউলের ক্লাউন টুলে কুঁজো হয়ে বসে গোগ্রাসে খাবার গিলছে। ইতোমধ্যে তাদের জানা হয়ে গেছে যে ক্লাউনের দেহটা ছোট হলেও নামটা রাজাদের মতো-ম্যাগনিফিসো জায়গান্টিকাস।

বেইটা রান্না ঘরে যখন ঢুকছে বেরোচ্ছে শুধুমাত্র তখনই বিষণ্ণ চোখ তুলে সে তাকাচ্ছে বেইটার গমনপথের দিকে।

“জানি আমার মতো নগণ্য মানুষের ধন্যবাদের কোনো মূল্য নেই”, ফিসফিস করে বলল সে। “তবুও আপনাকে ধন্যবাদ। গত এক সপ্তাহে মানুষের উচ্ছিষ্ট ছাড়া কিছু জোটেনি কপালে। দেহটা ছোট হলে কি হবে, ক্ষুধা খুব বেশি।”

“বেশ, তা হলে খাও”! মৃদু হেসে বেইটা বলল। “ধন্যবাদ দিয়ে সময় নষ্ট করো না। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নিয়ে সেন্ট্রাল গ্যালাক্সির একটা প্রবাদ আছে, তাই না?

“সত্যিই আছে, মাই লেডি, একজন শিক্ষিত লোকের কাছে শুনেছিলাম, ফাঁকা বুলি না আওড়ালেই কৃতজ্ঞতা সবচেয়ে সুন্দর এবং কার্যকরী হয়ে উঠে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাই লেডি, আমার কাছে ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নেই। এই ফাঁকা বুলি শুনিয়েই মিউলকে খুশি করেছিলাম, ফলে একটা বাহারি নাম আর দরবারে জায়গা পেয়েছি। আমার পূর্বের নাম ছিল বোবো, এটা তাকে খুশি করতে পারেনি। আর তাকে খুশি করতে না পারলে সহ্য করতে হত চাবুকের আঘাত।”

পাইলট রুম থেকে ডাইনিংরুমে প্রবেশ করল টোরান। “এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। ফাউণ্ডেশন শিপ মানেই ফাউণ্ডেশন টেরিটোরি, আশা করি মিউল কথাটা জানে।”

ম্যাগনিফিসে জায়গান্টিকাস চোখ বড় করে বিস্মিত সুরে বলল, “ফাউণ্ডেশন কত শক্তিশালী যার সামনে মিউলের অনুগত নিষ্ঠুর লোকদেরও হাঁটু কাঁপতে শুরু করে।”

“তুমিও ফাউণ্ডেশন-এর কথা শুনেছ?” মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল বেইটা।

“কে শোনেনি?” ফিসফিস করে বলল ম্যাগনিফিসো। “অনেকেই বলে ওটা জাদু আগুন এবং গোপন শক্তিতে পরিপুর্ণ একটা বিশ্ব যা অন্য গ্রহগুলোকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। আমার মতো একটা নগণ্য মানুষও শুধুমাত্র ‘আমি ফাউণ্ডেশন-এর নাগরিক, এই কথাটা বলে যে সম্মান আর নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে গ্যালাক্সির অন্য কোনো ক্ষমতাশালী এবং সম্পদশালী ব্যক্তিও তা পারবে না।”

“শোন, ম্যাগনিফিসো, এভাবে বক্তৃতা দিলে খাওয়া আর শেষ হবে না কোনোদিন। দাঁড়াও, দুধ এনে দিচ্ছি। খেতে ভালো লাগবে।”

টেবিলের উপর দুধের পাত্র রেখে টোরানকে সরে আসার জন্য ইশারা করল বেইটা।

“টোরি, এখন আমরা কী করব ওর ব্যাপারে?” রান্নাঘরের দিকে ইঙ্গিত করল সে।

“মানে?”

“মিউল যদি আসে আমরা কী ওকে মিউলের হাতে তুলে দেব?”

“আর কী করার আছে, বে?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর আর যেভাবে কপালের উপর থেকে একগোছা কোঁকড়া চুল সরাল তাতে তার উদ্বেগ আরো পরিষ্কার হল।

অধৈর্য সুরে বলতে লাগল টোরান, “এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম মিউলের খোঁজ খবর করে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। তারপর কাজ শুরু করতাম। কী কাজ সেটার অবশ্য কোনো ধারণা ছিল না।”

“বুঝতে পেরেছি, টোরি । মিউলকে স্বচক্ষে দেখব আশা করিনি, কিন্তু আমিও ভেবেছিলাম এখানে এসে একটা না একটা পথ পাওয়া যাবেই। আমি তো আর গল্পের বই-এর কোনো স্পাই না।”

“তুমি আমার থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই, বে।” বুকে হাত বেঁধে ভুরু কোঁচকালো টোরান। “কী একটা পরিস্থিতি! শেষের অস্বাভাবিক ঘটনাটা না ঘটলে তুমি বুঝতেই না যে মিউল নামে কেউ আছে। তোমার কী মনে হয় ক্লাউনকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সে আসবে?

মুখ তুলল বেইটা। “জানি না। বুঝতে পারছি না কী করা উচিত বা বলা উচিত। তুমি পারছ?”

কর্কশ শব্দে বাজার বেজে উঠল। নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ল বেইটা, “মিউল”! দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

ম্যাগনিফিসোর দৃষ্টি বিস্ফোরিত, ভয়ে গলা কাঁপছে! “মিউল!”

“ওদেরকে ভিতরে নিয়ে আসা উচিত।” ফিসফিস করে বলল টোরান।

একটা কন্টাক্ট এয়ার লক খুলে দিল আর বাইরের দরজা বন্ধ করে দিল আগন্তুকের পিছনে। ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা শুধু মাত্র একজন মানুষের আবছা অবয়ব ফুটে উঠেছে স্ক্যানারে।

“মাত্র একজন,” স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল টোরান, সিগন্যাল টিউবের উপর ঝুঁকে যখন কথা বলল তখনো অবশ্য গলা কাঁপছে, “কে আপনি?”

“ভেতরে আসতে দিলেই জানতে পারবেন, তাই না?” রিসিভারের মাধ্যমে চিকন গলার জবাব ভেসে এল।

“আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত যে এটা ফাউণ্ডেশন শিপ এবং আন্ত মহাকাশীয় চুক্তি অনুযায়ী ফাউন্ডেশন টেরিটোরি হিসেবে গণ্য।”

“আমি জানি।”

“অস্ত্র বাইরে রেখে আসবেন, নইলে শুট করব। আমার কাছে অস্ত্র আছে।”

“ঠিক আছে।”

ভিতরে ঢোকার দরজা খুলে দিল টোরান, ব্লাস্টারের কন্টাক্ট বন্ধ করলেও বুড়ো আঙুল সরাল না। এগিয়ে আসার পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সাবলীলভাবে দরজা খুলে গেল, এবং সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল ম্যাগনিফিসো, “ও মিউল না, অন্য মানুষ”।

‘মানুষটা’ ক্লাউনের দিকে ফিরে সুন্দর করে মাথা ঝাঁকাল। “ঠিকই ধরেছ, আমি মিউল না।” হাতদুটো শরীর থেকে দূরে সরিয়ে বলল, “আমি নিরস্ত্র আর আপনাদের বিপদে ফেলার কোনো উদ্দেশ্য নেই। শান্ত হোন, দয়া করে অস্ত্রটা সরান। হাত যেভাবে কাঁপছে তাতে মনে শান্তি পাচ্ছি না।”

“কে আপনি?” চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল টোরান।

“প্রশ্নটা তো আমি আপনাকে করব”, শীতল কণ্ঠে জবাব দিল আগন্তুক। “যেহেতু আমি না, আপনি একটা ভুল ধারণা তৈরির চেষ্টা করছেন।”

“কীভাবে?”

“নিজেকে আপনি ফাউণ্ডেশন-এর নাগরিক হিসেবে দাবি করেছেন অথচ এই গ্রহে কোনো অথরাইজড ট্রেডার এই মুহূর্তে বেড়াতে আসেনি।”

“ঠিক এইরকম কিছু না। কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?”

“আমি ফাউণ্ডেশন-এর নাগরিক এবং সেটা প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে। আপনার আছে?”

“আমার মনে হয় আপনি চলে গেলেই ভালো করবেন।”

“আমার তা মনে হয় না। ফাউণ্ডেশন-এর আইন সম্বন্ধে আপনার ধারণা থাকুক আর নাই থাকুক, আপনাকে জানানো উচিত যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমি ফিরে না গেলে ফাউণ্ডেশন-এর নিকটস্থ সদর দপ্তর সতর্ক হয়ে উঠবে-তখন আপনার অস্ত্র কোনো কাজেই আসবে না।”

থমথমে নীরবতা নেমে এল, তারপর বেইটা শান্ত স্বরে বলল, “বন্দুক সরাও, টোরান, উনি বোধহয় সত্যি কথাই বলছেন। মুখের কথায় বিশ্বাস করা যায়।”

“ধন্যবাদ।” আগন্তুক বলল।

পাশের চেয়ারে অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলল টোরান, “আমার বিশ্বাস এবার সব ভোলাসা করে বলবেন আপনি।”

আগম্ভক দাঁড়িয়ে থাকল। পেশিবহুল লম্বা চওড়া দেহ, সমতল মুখে নির্দয় নিষ্ঠুরতার স্থায়ী ছাপ স্পষ্ট, পরিষ্কার বোঝা যায় এই লোক জীবনে কোনোদিন হাসেনি। কিন্তু তার চোখে নিষ্ঠুরতার কোনো ছাপ নেই।

“খবর বাতাসের আগে দৌড়ায়,” বলল সে, “বিশেষ করে যদি তা হয় অবিশ্বাস্য খবর। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে কালগানের কারো জানতে বাকি নেই যে ফাউণ্ডেশন-এর দুজন ট্যুরিস্ট মিউলের লোকদের মুখে ঝাটা মেরেছে। সন্ধ্যার আগেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমরা জেনে ফেলি।”

“আমরা’ মানে কারা?”

“আমরা’-’আমরাই’! আমি তাদেরই একজন। জানি আপনারা হ্যাঁঙ্গারে আছেন। রেজিস্ট্রি চেক করার সময় এবং এই জাহাজ খুঁজে বের করার জন্য নিজস্ব কায়দা কাজে লাগিয়েছি।”

হঠাৎ পুরো শরীর নিয়ে বেইটার দিকে ঘুরল, “আপনি ফাউণ্ডেশন-এর নাগরিক-জন্মসূত্রে, তাই না?”

“তাই নাকি?”

“বিরোধী ডেমোক্রেটিক দলের সদস্য-আপনারা বলেন ‘দ্য আণ্ডারগ্রাউণ্ড। নাম মনে নেই, তবে চেহারা মনে আছে। কিছুদিন আগে বেরিয়ে এসেছেন-তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ কেউ হলে বেরোতে পারতেন না।”

শ্রাগ করল বেইটা, “অনেক কিছুই জানেন।”

“জানতে হয়। আপনি কী তাকে নিয়েই ফাউণ্ডেশন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন?”

“আমি যাই বলি তার কোনো মূল্য আছে?”

“না। আমি শুধু চাই আমরা পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করব। আমার বিশ্বাস আপনি যে সপ্তাহে চলে আসেন তখন পাসওয়ার্ড ছিল, ‘সেলডন, হার্ডিন, এবং মুক্তি। পোরফিরাট হার্ট ছিল আপনার সেকশন লিডার।”

“আপনি কীভাবে জানেন?” হঠাৎ করেই মারমুখো হয়ে উঠল বেইটা। “পুলিশ তাকে ধরে ফেলেছে?” পিছন থেকে ধরে রাখার চেষ্টা করল টোরান, কিন্ত ঝাড়া মেরে নিজেকৈ ছাড়িয়ে সামনে এগোলো।

ফাউণ্ডেশন-এর আগম্ভক শান্ত গলায় বলল, “কেউ তাকে ধরেনি। আসলে আণ্ডারগ্রাউণ্ড তার ডালপালা ভালোভাবেই ছড়িয়েছে। এমনকি অস্বাভাবিক জায়গাতেও। আমি ক্যাপ্টেন হ্যান প্রিচার অফ ইনফর্মেশন, এবং আমি একজন সেকশন লিডার-কী নামে সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।”

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সে, তারপর বলল, ‘না, আমাকে বিশ্বাস করতে হবে না। আমাদের যে কাজ তাতে অতিরিক্ত সন্দেহ করাটাই জান বাঁচানোর জন্য নিরাপদ। তবে আমার বোধহয় এসব প্রাথমিক ব্যাপারগুলো বাদ দেওয়া উচিত।”

“হ্যাঁ,” বলল টোরান, “সেটাই করুন।”

“বসতে পারি? ধন্যবাদ।” পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারের পেছনে একটা হাত ঝুলিয়ে বসল ক্যাপ্টেন প্রিচার। প্রথমেই বলে রাখি পুরো ব্যাপারটা আপনারা কীভাবে দেখছেন, আমি জানি না। আপনারা ফাউণ্ডেশন থেকে আসেননি, কিন্তু এটা অনুমান করতে কষ্ট হবার কথা নয় যে এসেছেন কোনো একটা স্বাধীন বণিক বিশ্ব থেকে। এটা নিয়েও আমি খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছি না। শুধু জানার কৌতূহল হচ্ছে, এই লোকের কাছে আপনারা কী চান, যে ক্লাউনকে বিপদ থেকে রক্ষা করছেন, কাছে রাখার জন্য নিজের জীবনের উপর ঝুঁকি নিচ্ছেন?”

“সেটা আপনাকে আমি বলতে পারব না।”

“হুম-ম-ম। বলবেন আশা করিনি। কিন্তু যদি ভেবে থাকেন ঢাকঢোল বাজিয়ে মিউল আপনাদের কাছে আসবে-তা হলে ভুল করছেন! মিউল এভাবে কাজ করে না।”

“কী?” টোরান এবং বেইটা এক সাথে বলল, আর ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাগনিফিসোর মুখে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ল উফুল্ল হাসি।

“ঠিকই বলছি। আমি নিজে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, এবং আপনাদের মতো নবিশের চাইতে আরো সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করেছি। লাভ হয়নি। লোকটা কখনো জনসম্মুখে দেখা দেয় না, নিজের ছবি বা মূর্তি তৈরি করতে দেয় না, এবং ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহকারী ছাড়া কেউ তাকে সরাসরি দেখেনি।”

“আর সেইজন্যই আপনি আমাদের দিকে মনযোগ দিয়েছেন, তাই না, ক্যাপ্টেন?” প্রশ্ন করল টোরান।

“না। দ্যাট ক্লাউন ইজ দ্য কি। যে কয়েকজন মিউলকে স্বচক্ষে দেখেছে এই ক্লাউন সেই অল্প কয়েকজনের একজন। তাকে আমার চাই। হয়তো কিছু প্রমাণ পাওয়া যাবে এবং আমার একটা কিছু দরকার। গ্যালাক্সির কসম, ফাউণ্ডেশনকে জাগিয়ে তোলার জন্য একটা কিছু দরকার।”

“জাগিয়ে তুলতে হবে?” ধারালো গলায় বলল বেইটা। “কিসের বিরুদ্ধে? আর এলার্ম হিসেবে আপনি কোন ভূমিকা পালন করবেন, বিদ্রোহী ডেমোক্র্যাট নাকি গুপ্তপুলিস?”

ক্যাপ্টেনের মুখের রেখাগুলো আরো কঠিন হল। “ফাউণ্ডেশন-এর বিপদ হলে ডেমোক্র্যাট এবং স্বৈরশাসক দুই পক্ষই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বরং স্বৈরশাসককেই রক্ষা করা উচিত, কারণ একসময় না এক সময় তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যাবে।”

“সবচেয়ে বড় স্বৈরশাসক কে?” রাগে ফেটে পড়ল বেইটা।

“মিউল। আমি বেশকিছু তথ্য জেনেছি, দ্রুত পদক্ষেপ না নিতে পারলে কয়েকবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ক্লাউনকে যেতে বলুন, প্রাইভেসি দরকার।”

“ম্যাগনিফিসো,” ইশারা করল বেইটা, নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল ক্লাউন।

ক্যাপ্টেনের কণ্ঠস্বর গম্ভীর, তীক্ষ্ণ এবং এতই নিচু যে টোরান এবং বেইটা আরো কাছে এগিয়ে আসতে বাধ্য হল।

“মিউল বুদ্ধিমান এক চৌকস খেলোয়ার-নেতৃত্বের গ্ল্যামার এবং আকর্ষণী ক্ষমতার যে অনেক সুবিধা আছে সেটা বোঝার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমান। ব্যাপারটা এড়িয়ে চলার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। সম্ভবত জনসম্মুখে তার উপস্থিতি এমন কিছু প্রকাশ করে দেবে যা প্রকাশ না করাটাই জরুরি।”

হাত নেড়ে প্রশ্ন করতে নিষেধ করল সে, এবং দ্রুত কথা বলতে লাগল, “আমি ওর জন্মস্থানে গিয়েছিলাম। অনেককে প্রশ্ন করেছি। সব কথা মনে নেই তাদের। তাকে যারা চিনত-জানত, তাদের বেশিরভাগই মারা গেছে। তবে ত্রিশ বছর আগে জন্ম নেওয়া শিশুটি, তার মায়ের মৃত্যু, এবং তার অস্বাভাবিক যৌবনকালের কথা মনে আছে। মিউল আসলে মানুষ না।”

আতঙ্কে শ্রোতা দুজন ঝট করে পিছিয়ে গেল, শেষ কথাটার অর্থ পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও কথাটার মাঝে যে বিপদ এবং হুমকি লুকিয়ে আছে সেটা ঠিকই বুঝতে পেরেছে।

ক্যাপ্টেন বলে চলেছে, “হি ইজ এ মিউট্যান্ট, এবং নিঃসন্দেহে সফল একজন। তার ক্ষমতা কতদূর আমার জানা নেই, বলতে পারব না ত্রিমাত্রিক ‘থ্রিলারে যে সুপারম্যানদের দেখানো হয় তাদের সাথে মিউলের মিল কতখানি। তবে শূন্য থেকে শুরু করে কালগানের ওয়ারলর্ডদের পরাজিত করার মাধ্যমে অনেক কিছুই প্রকাশ করে। বিপদটা কোথায় আপনারা বুঝতে পারছেন না? জেনেটিক দুর্ঘটনার কারণে অস্বাভাবিক ক্ষমতা নিয়ে বেড়ে উঠা কোনো বস্তুর কথা সেলডন প্ল্যানে বিবেচনা করা হয়েছে?”

ধীরে ধীরে কথা বলল বেইটা, “আমি বিশ্বাস করি না। এটা কোন ধরনের কূটকৌশল। যদি সুপারম্যানই হয় তা হলে সুযোগ পেয়েও মিউলের লোকেরা আমাদের হত্যা করেনি কেন?”

“বলেছি তো, তার মিউটেশনের মাত্রা কতদূর আমি জানি না। হয়তো ফাউণ্ডেশন-এর সাথে লড়াই করার জন্য সে এখনো প্রস্তুত হয়নি, এবং প্রস্তুতি না নিয়ে কোনো ধরনের উসকানিমূলক আচরণ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এবার আমাকে ক্লাউনের সাথে কথা বলতে দিন।”

ভয়ে কাঁপছে ম্যাগনিফিসো, মুখোমুখি দাঁড়ানো বিশালদেহী নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটাকে সে একটুও বিশ্বাস করতে পারছে না।

ধীরে ধীরে শুরু করল ক্যাপ্টেন, “মিউলকে তুমি স্বচক্ষে দেখেছ?”।

“দেখেছি, রেসপ্যাকটেড স্যার, এবং নিজ দেহের উপর তার বাহুর ওজন অনুভব করেছি।”

“তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেমন দেখতে একটু বর্ণনা করতে পারবে?”

“মনে হলেই কলজে শুকিয়ে যায়, রেসপ্যাকটেড স্যার। এই এ্যাত্তো বড় শরীর। ওর সামনে এমনকি আপনাকেও কচি খোকা মনে হবে। আগুনের মতো লাল চুল, একবার হাত এভাবে উপরে তুলে রেখেছিল আর আমি পুরো শক্তি আর পুরো ওজন দিয়েও একচুল নামাতে পারিনি। জেনারেলদের সামনে বা তার সামনে মজা দেখানোর সময় বেল্টে এক আঙুল ঢুকিয়ে আমাকে তুলে নিত উপরে। সেই অবস্থায় কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে হত। ওই অবস্থায় পুরো কবিতা আবৃত্তি করতে হত। ভুল হলে শুরু করো আবার প্রথম থেকে। অসীম শক্তিশালী মানুষ এবং তার চোখ, রেসপ্যাকটেড স্যার, কেউ কোনোদিন দেখেনি।”

“কী? শেষ কথাটা কী বললে?”

“সে চশমা পরে, রেসপ্যাকটেড স্যার, অদ্ভুত ধরনের চশমা। বলা হয়ে থাকে, সেগুলো স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী জাদুর সাহায্যে সে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দেখতে পারে। আমি শুনেছি,” তার কণ্ঠস্বর আরো নিচু এবং রহস্যময় হয়ে উঠল, “যে তার চোখের দিকে তাকানো মানেই মৃত্যু।”

শ্রোতাদের মুখের দিকে দ্রুত দৃষ্টি বোলালো ম্যাগনিফিসো। কৃশকায় দেহ কেঁপে উঠল একবার, “কথাগুলো সত্যি, স্যার। আমি বেঁচে আছি এটা যেমন সত্য, ঠিক সেরকম সত্য।”

লম্বা দম নিল বেইটা, “মনে হচ্ছে আপনার কথাই ঠিক, ক্যাপ্টেন। এখন আপনি কী করতে বলেন?”

“ঠিক আছে, পুরো পরিস্থিতিটা আরেকবার দেখা যাক। এখানে তো আপনাদের কোনো দেনা পাওনা নেই? হ্যাঁঙ্গারের উপরে বাধামুক্ত?”

“আমি যে-কোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারি।”

“তা হলে চলে যান। মিউল হয়তো ফাউণ্ডেশন-এর সাথে বিরোধে জড়াতে চাইছে না, কিন্তু ম্যাগনিফিসোকে ছেড়ে দিয়ে সে বিরাট ঝুঁকি নিয়েছে। কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে উপরে মিউলের কোনো শিপ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। স্পেসে আপনারা হারিয়ে গেলে কে মাথা ঘামাবে?”

“ঠিকই বলেছেন,” ফাঁকা গলায় বলল টোরান।

“যাই হোক আপনাদের শিল্ড আছে আর গতিতে ওদেরকে হারিয়ে দিতে পারবেন, কাজেই বায়ুমণ্ডল থেকে বেরনোর সাথে সাথে বৃত্তাকার গতিতে বিপরীত গোলার্ধে চলে যাবেন। তারপর ছুটবেন যত দ্রুত সম্ভব।”

“তারপর, “ ঠাণ্ডা গলায় বলল বেইটা, “ফাউণ্ডেশনে ফেরার পর আমাদের কী হবে, ক্যাপ্টেন?”

“কেন, আপনারা তখন ফাউণ্ডেশন-এর সু-নাগরিক, তাই না? আমি তো অন্য কিছু জানি না, জানি কি?”

কেউ কিছু বলল না। কন্ট্রোলের দিকে ঘুরল টোরান।

প্রথম হাইপার স্পেসাল জাম্প করার জন্য কালগান থেকে যথেষ্ট দূরে আসার পর এই প্রথম ক্যাপ্টেন প্রিচারের মুখে ভাঁজ পড়ল-কারণ মিউলের কোনো শিপ তাদের বাধা দেয়নি।

“মনে হচ্ছে ম্যাগনিফিসোকে নিয়ে যেতে আমাদের বাধা দেবে না সে। আপনার কাহিনীর জন্য খুব একটা ভালো হল না।”

“যদি না,” সংশোধন করে দিল ক্যাপ্টেন, “সে চায় যে আমরা তাকে নিয়ে যাই, সেক্ষেত্রে তা ফাউণ্ডেশন-এর জন্য খুব একটা ভালো হবে না।”

শেষ হাইপারজাম্পের পর ফাউণ্ডেশন-এর নিউট্রাল ফ্লাইট ডিসট্যান্সে যখন পৌঁছল, তখন তাদের শিপে এসে পৌঁছল প্রথম হাইপার ওয়েভ সংবাদ।

এবং তারমধ্যে শুধু একটা সংবাদ উল্লেখ করার মতো। খবরের মূল বক্তব্য-ফাউণ্ডেশন-এর এক ওয়ারলর্ড-তিতবিরক্ত খবর পাঠক অবশ্য তার পরিচয় দিতে পারেনি-জোরপূর্বক মিউলের পরিষদের একজন সদস্যকে ধরে নিয়ে গেছে। তারপরই ঘোষক খেলার খবর পাঠ করতে লাগল।

“মিউল আমাদের চাইতে একধাপ এগিয়ে গেছে।” শীতল গলায় বলল ক্যাপ্টেন প্রিচার। “ফাউণ্ডেশন-এর জন্য সে তৈরি এবং এটাকে একটা উসিলা হিসেবে ব্যবহার করছে। পরিস্থিতি আমাদের জন্য আরো কঠিন হয়ে গেল। এখন প্রস্তুত হওয়ার আগেই অ্যাকশনে নেমে পড়তে হবে।”