অমাবস্যার রাত Omaboswar Raat by হেমেন্দ্রকুমার রায় Hemendra Kumar Roy, chapter name ছয় - কালো কালো হাত

ছয় - কালো কালো হাত

সেকি বৃষ্টি-ফোঁটা ফোঁটা করে নয়, অন্ধকার শূন্যের ভিতর থেকে যেন এক বিরাট প্রপাত হুড় হুড় করে জল ঢালছে আর ঢালছে।

চন্দ্ৰবাবুর সঙ্গে কুমার যে-ঝোপটার ভিতরে গিয়ে আশ্রয় নিলে, সেটা ছিল ঢালু জমির উপরে। অল্পক্ষণ পরেই তাদের প্রায় কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে দিয়ে কলকল আওয়াজে জলধারা ছুটতে লাগল।

চন্দ্রবাবু বিরক্তকণ্ঠে বললেন, কপাল যাদের নেহাৎ পোড়া, তারাই পুলিশে চাকরি নেয়।--শ্যাল-কুকুররাও আজ বাইরে নেই, আমরা তাদেরও অধম!

কুমার তাড়াক করে এক লাফ মেরে বললে, কি মুশকিল! সাপের মতো কি-একটা আমার গায়ের ওপর দিয়ে সাৎ করে চলে গেল!

--খুব সাবধান কুমার! বৰ্ষাকালে সুন্দরবনে সাপের বড় উৎপাত! একটা ছোবল মারলেই ভবলীলা একেবারে সাঙ্গ।...দেখ, দেখ, ঐ দেখ! মাঝে মাঝে ইলেকট্রিক টর্চ জ্বলিয়ে কারা সব এই দিকেই আসছে! নিশ্চয়ই ভুলু-ডাকাতের দল!

কুমার বললে, ভুলু-ডাকাতকে আপনি কখনো দেখেছেন?

--কেউ কোনোদিন তাকে দেখেনি। সে নিজে দলের সঙ্গে থাকে না। দলের সঙ্গে থাকে কালু-সর্দার, সে ভুলুর হুকুম মতো দলকে চালিয়ে নিয়ে বেড়ায়। কালু-সর্দারকে আমি দেখেছি, সে যেন এক মাংসের পাহাড়, মানুষের দেহ যে তেমন বিপুল হতে পারে, না দেখলে আমি তা বিশ্বাস করতুম না। কালুর গায়ে জোরও তেমনি। শুনেছি, সে নাকি শুধুহাতে এক আছাড়ে একটা বাঘকে বধ করেছিল। একবার সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। কিন্তু রাত্ৰিবেলায় হাজত-ঘরের দেওয়াল থেকে আস্ত জানলা উপড়ে ফেলে সে চম্পট দেয়।”

চন্দ্ৰবাবুর কথা শুনতে শুনতে কুমার দেখতে লাগল, চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত তফাৎ দিয়ে ডাকাতের দল ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের কারুকে দেখা যাচ্ছিল না বটে, কিন্তু বিজলী মশালগুলোর আলো দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল তাদের গতি কোন দিকে।

চন্দ্ৰবাবু বললেন, দু-একটা আশ্চর্য রহস্যের কোনো কিনারাই আমি করতে পারছি না। ভুলু-ডাকাতের দল ডাকাতি করতে বেরোয় কেবল অমাবস্যার রাত্রে। আর যে-অঞ্চলেই তার দল ডাকাতি করতে যায়! , সেখানেই বাঘের বিষম অত্যাচার হয়। বাঘের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেই তারা যেন চাকাতি করতে যায়। একবার একজন সাহেব-গোয়েন্দা ভুলুকে ধরতে এসেছিল। কিন্তু শেষটা বাঘের কবলেই তার প্রাণ যায়। লোকের মুখে শুনি বাঘই নাকি ভুলুর ইষ্টদেবতা, রোজ সে বাঘ-পুজো করে!

--বাঘ-পুজো?

—হাঁ। সুন্দরবনে এটা কিছু নতুন কথা নয়। অনেকেই এখানে বাঘকে পুজো করে।

--দেখুন, দেখুন! ডাকাতের দল অন্য দিকে যাচ্ছে।

--হাঁ, ঐ দিকেই মোহনলালের বাসায় যাবার পথ। ওরা যে মোহনলালের বাসার দিকেই যাবে, সেটা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলুম। পটলবাবুর সন্দেহ ভুল-মোহনলাল যদি ভুলুর দলের লোক হতো, তাহলে ডাকাতরা কখনোই তার বাড়ি লুঠ করতে আসত না।

কুমার বললে, এখন আপনি কি করবেন?

পকেট থেকে একটা বাঁশিবার করে চন্দ্ৰবাবু বললেন, এইবারে আমি বাঁশি বাজাব। ডাকাতরা জানে না, ওরা আজ কী ফাঁদে পা দিয়েছে! আমি বাঁশি বাজালেই আমার দলের লোকেরা ওদের ঘেরাও করে ফেলবে। কুমার প্রস্তুত হও!--চন্দ্রবাবু বঁশি বাজাতে উদ্যত হলেন।

সেই মুহূর্তেই তীব্র স্বরে একটা ফুটবল-বাঁশি বেজে উঠল-কিন্তু সে চন্দ্ৰবাবুর বাঁশি নয়।.ডাকাতদের বিজলী মশালগুলো এক পলকে নিবে গেল!

চন্দ্ৰবাবু এক লাফে ঝোপের বাইরে এসে বললেন, ও বাঁশি কে বাজালে? ডাকাতদের কে সাবধান করে দিলে ?-- বলতে বলতে তিনিও বাঁশিতে ফুঁ দিলেন-একবার, দুবার, তিনবার! জঙ্গলের চারিদিকে পুলিশের লণ্ঠন জ্বলে উঠল, চারিধারে ঝোপঝাপ থেকে দলে দলে পুলিশের লোক বেরিয়ে এল-তাদের কারুর হাতে বন্দুক, কারুর হাতে লাঠি!

চন্দ্ৰবাবু চীৎকার করে বললেন, ডাকাতরা পালাচ্ছে, ওদের আক্রমণ কর! ঐদিকে ঐদিকে-শিগগির!

চন্দ্ৰবাবু ও কুমার রিভলভার ও বন্দুক ছুঁড়তে ছুঁড়তে ডাকাতরা যেদিকে ছিল সেইদিকে ছুটতে লাগলেন!

কিন্তু যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে চন্দ্ৰবাবু ডাকাতদের কারুর টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পেলেন না। দারুণ বৃষ্টিতে মাটির উপর দিয়ে যেন বন্যা ছুটছে, এলোমেলো ঝোড়ো হাওয়ায় বনজঙ্গল উচ্ছৃঙ্খল ভাবে দুলছে, বিজলী-মশালের সীমানার বাইরে অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে, এর মধ্যে ডাকাতরা যে কোথায়, কোনদিকে গা ঢাকা দিয়েছে তা স্থির করা অসম্ভব বললেই চলে।

চন্দ্রবাবু হতাশ ভাবে বললেন, নাঃ, আজও খালি কাদা ঘেঁটে মরাই সার হল দেখছি। কিন্তু কোন রাস্কেল বাঁশি বাজিয়ে তাদের সাবধান করে দিলে, সেটা তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না!

কুমার বললে, বোধ হয় ডাকাতদের কোনো চর বনের ভেতরে লুকিয়ে থেকে আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিল!

--সম্ভব। কিন্তু আর এখানে অপেক্ষা করে লাভ নেই, আমরা--চন্দ্ৰবাবুর কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ পাশের জঙ্গলের ভিতর থেকে দু-খানা বড়ো বড়ো কালো হাত বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে এল এবং পরমুহূর্তে তারা কুমারকে ধরে শূন্যে তুলে নিয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল, কুমার একটা চীৎকার করবার অবসর পর্যন্ত পেলেনা। বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিয়ে কুমার নিজেকে মুক্ত করবার চেষ্টা করলে, সঙ্গে সঙ্গে সেই মহা-বলবান অজ্ঞাত শত্রু তার দেহ ধরে এমন এক প্রচণ্ড ঝাঁকানি দিলে যে, তার সমস্ত জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেল।