ফাউণ্ডেশন অ্যাণ্ড এম্পায়ার by আইজাক আসিমভ, chapter name দ্বিতীয় পর্ব : দ্য মিউল - ১৩. লেফটেন্যান্ট এবং ক্লাউন

দ্বিতীয় পর্ব : দ্য মিউল - ১৩. লেফটেন্যান্ট এবং ক্লাউন

যদি, সাত হাজার পারসেক দূরে মিউল এর আর্মির হাতে কালগানের পতন বৃদ্ধ এক বণিকের কৌতূহল বাড়িয়ে তুলে, নাছোড়বান্দা এক ক্যাপ্টেনের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলে এবং খুঁটিনাটি বিষয়ে  ৩৩অতি যত্নশীল এক মেয়রের বিরক্তি উৎপাদন করে-কালগানের কাছে তা পুরোপুরি মামুলি ব্যাপার। সেখানে কারোরই এসব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। মানবজাতির জন্য অপরিবর্তনীয় শিক্ষা হল যে দূরবর্তী সময় এবং সেই সাথে স্পেস মনযোগের কেন্দ্র বিন্দু হওয়া উচিত। কিন্তু ঘটনাক্রমে এর কোনো রেকর্ড নেই, তাই নিশ্চিত করে বলা যায় না যে এই শিক্ষা স্থায়ীভাবে অর্জিত হয়েছে।

কালগান সবসময়ই ছিল-কালগান। গ্যালাক্সিতে মনে হয় একমাত্র সেই জানে যে ধ্বংস হয়ে গেছে এম্পায়ার, ভেঙে খান খান হয়ে গেছে বিশাল এক স্থাপনা, অদৃশ্য হয়ে গেছে শান্তি নামক আরাধ্য বস্তু।

কালগান ছিল লাক্সারি ওয়ার্ল্ড। যেখানে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে মানবজাতীর বহুদিনের গড়ে তোলা স্বপ্নসৌধ, সেখানে সে তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছিল বিনোদনের উৎপাদক, স্বর্ণের ক্রেতা, এবং অবসর সময়ের বিক্রেতা হিসেবে।

ইতিহাসের উত্থান পতন তার উপর কোনো প্রভাব ফেলেনি, কারণ কোন দখলদার এমন একটা গ্রহের ক্ষতি করবে যেখান থেকে চাইলেই যে-কোনো পরিমাণ নগদ অর্থ পাওয়া যাবে, যে অর্থ দিয়ে কেনা যাবে নিরাপত্তা।

কিন্তু শেষপর্যন্ত কালগানও পরিণত হল একজন ওয়ারলর্ডের সদর দপ্তরে এবং যুদ্ধের জরুরি প্রয়োজনে তার কোমলতা কিছুটা মলিন হল।

তার কৃত্রিম বনাঞ্চল, নির্দিষ্ট আদলে গড়ে তোলা বেলাভূমি, জাকজমকপূর্ণ নগরীর রাজপথ মুখরিত হল আমদানি করা মার্সেনারিদের পদভারে, নতুন চমকে চমকিত হল নাগরিকরা। সমরসজ্জা বাড়ানো হল প্রাদেশিক বিশ্বগুলোতে এবং গ্রহের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো অর্থ বিনিয়োগ করা হল ব্যাটলশিপ তৈরির জন্য। নতুন শাসক প্রমাণ করে দিল যে সে তার নিজের যা আছে তা দখলে রাখার জন্য এবং অন্যের যা আছে তা দখল করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সে ছিল গ্যালাক্সির সেরাদের একজন, একইসাথে যুদ্ধের মদদদাতা এবং শান্তি স্থাপনকারী, একটা এম্পায়ারের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং একটা ডাইন্যাস্টির প্রতিষ্ঠাতা।

তার কোনো নাম নেই, শুধু একটা অদ্ভুত ধরনের ছদ্মনাম নিয়েই সে গড়ে তুলেছে একটা বিকাশোখ এম্পায়ার-অথচ একটা যুদ্ধও লড়তে হয়নি।

কাজেই কালগান আবার হয়ে গেলো আগের মতো, এবং বাহারি পোশাক পড়া নাগরিকরা দ্রুত ফিরে গেল তাদের আগের জীবনে আর বহিরাগত যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা সহজেই মিশে যেতে পারল এই জীবন স্রোতের সাথে।

আবারও বরাবরের মতো জঙ্গলে পোষা প্রাণী শিকারের বিলাসবহুল আয়োজন, যে প্রাণীগুলো কখনো মানুষ বধ করেনি; স্পিডস্টারে করে আকাশে চড়ে পাখি শিকার, যা শুধু মাত্র বড় আকারের পাখিগুলোর জন্য বিপদের কারণ।

শহরগুলোতে গ্যালাক্সির সমস্যাসংকুল জনজীবন থেকে যারা পালিয়ে এসে স্বস্তি পেতে চায় তারা নিজেদের পকেটের ওজন অনুযায়ী যে-কোনো ধরনের বিনোদনের সুযোগ নিতে পারে, হাফ ক্রেডিটের বিনিময়ে মেঘের উপর ভাসমান জমকালো প্রাসাদ ভ্রমণ-যা তাদের সামনে খুলে দেয় কল্পলোকের দুয়ার থেকে শুরু করে, বিশেষ এবং, গোপনীয় শিকারের সুযোগ যেখানে শুধু অত্যধিক সম্পদশালীরাই প্রবেশ করতে পারে।

এই বিপুল স্রোতের মাঝে, টোরান এবং বেইটা নতুন কোনো মাত্রা যোগ করতে পারল না। ইস্ট পেনিনসুলার কমন হ্যাঁঙারে মহাকাশ যান রেজিস্টার করিয়ে তারা চলে গেল মধ্যবিত্তদের জন্য উপযুক্ত ভ্রমণ কেন্দ্র বড় বড় দ্বীপ দ্বারা বেষ্টিত সাগর সৈকতে-যেখানে বিনোদন এখনো আইনসিদ্ধ এবং রুচিশীল-এবং মানুষের ভিড় কম।

আলো থেকে বাঁচার জন্য বেইটা চোখে লাগিয়েছে গাঢ় রঙের গ্লাস আর তাপ থেকে বাঁচার জন্য গায়ে চড়িয়েছে পাতলা সাদা রোব। উষ্ণ সোনালি এক জোড়া বাহু তার হাঁটু জড়িয়ে ধরল, মুগ্ধ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকল তার স্বামীর দীর্ঘ পেশিবহুল শরীরের দিকে-সাদা সূর্যের আভায় প্রায় জ্বলজ্বল করছে।

“বেশি রোদ লাগিয়ো না”, বলল সে, কিন্তু টোরানের গাত্রবর্ণ এরই মাঝে মৃতপ্রায় লাল নক্ষত্রের বর্ণ ধারণ করেছে। তিন তিনটা বছর ফাউণ্ডেশনে কাটানোর পরেও সূর্যের আলো তার কাছে চরম বিলাসিতা। আজকে নিয়ে পরপর চারদিন সে ঘুরে বেড়িয়েছে পুরোপুরি উদোম শরীরে। ছোট একটা শর্টস ছাড়া কিছুই পড়েনি।

বালিতে হামাগুড়ি দিয়ে কাছাকাছি হল বেইটা, কথা বলল ফিসফিস করে।

হতাশ সুরে টোরান বলল, “না, স্বীকার করছি এখনো কিছু পাইনি। কিন্তু কোথায় সে? কে সে? এই উন্মাদ বিশ্বে তার ব্যাপারে কোনো আলোচনা নেই। হয়তো কোনো অস্তিত্বই নেই তার।”

“আছে, প্রায় ঠোঁট না নেড়েই জবাব দিল বেইটা। “খুব বেশি চতুর, ব্যস। তোমার চাচা ঠিকই বলেছেন। এই লোককে আমরা ব্যবহার করতে পারব-যদি এখনো সময় থাকে।”

সাময়িক নীরবতা। তারপর ফিসফিস করে বলল টোরান, “আমি কি করছি জানো, বে? দিবাস্বপ্ন দেখছি। এত চমৎকারভাবে ঘটনাগুলো ঘটছে।” তার কণ্ঠস্বর নিমজ্জিত হয়েই আবার ফিরে এল আগের মাত্রায়। “বে, কলেজে ড. আমান কীভাবে কথা বলতেন মনে আছে? ফাউণ্ডেশন কখনো পরাজিত হতে পারে না, কিন্তু তার মানে এই না যে ফাউণ্ডেশন-এর শাসকদের পরাজিত করা যাবে না। ইতিহাস কী বলে? ফাউণ্ডেশন-এর প্রকৃত ইতিহাস শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন এনসাইক্লোপেডিস্টদের বিতাড়িত করে স্যালভর হার্ডিন প্রথম মেয়র হিসেবে টার্মিনাস গ্রহ দখল করেন। এবং পরবর্তী শতাব্দীতে হোবার ম্যালো জোরালো প্রচেষ্টার দ্বারা ক্ষমতা দখল করেননি? দুইবার শাসকরা পরাজিত হয়েছে, কাজেই এটা সম্ভব। তা হলে আমাদের দ্বারা হবে না কেন?”

“এটা পাঠ্য বইয়ের পুরোনো বিতর্ক, টোরি। চমৎকার একটা কল্পনার কী চরম অবনতি।”

“তাই? খেয়াল করো। হেভেন কী? ফাউণ্ডেশন-এর অংশ, তাই না? আমরা জয়ী হলে জিতবে কে, ফাউণ্ডেশন। শুধু বর্তমান শাসকরা পরাজিত হবে।”

“করতে পারব এবং করব’ এ দুটোর মাঝে অনেক পার্থক্য, টোরি। তুমি প্রলাপ বকছ।”

মুখ বাঁকা করল টোরান। “নাহ্, বে, তুমি এখন তোমার সেই বাজে মুডে আছ। আমার আনন্দটা কেন মাটি করতে চাও? বাদ দাও, আমি এখন ঘুমাবো।”

কিন্তু বেইটা সারসের মতো গলা বাড়িয়ে হঠাৎ আগাম কোনো নোটিশ না দিয়েই হেসে উঠল খিল খিল করে। গগলস্ নামিয়ে এক হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে তাকাল বিচের দিকে।”

একটা লম্বা কৃশকায় অবয়ব দেখছে সে, পা দুটো উপরে তুলে দুহাতে ভর দিয়ে টলমল করে হাঁটছে আশপাশের মানুষদের আনন্দ দেবার জন্য। উপকূলের হাজার হাজার অ্যাক্রোবেটিক ভিক্ষুকদের একজন, শরীরের নমনীয় জোড়াগুলো বাঁকিয়ে ঝট করে তুলে নিচ্ছে ছুঁড়ে দেওয়া কয়েন।

একজন বিচ গার্ড এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে আর ক্লাউন আশ্চর্যরকম দক্ষতায় এক হাতে ভারসাম্য রেখে আরেক হাতের বুড়ো আঙুল দেখাল। খেপে গিয়ে গার্ড এগোলো আক্রমণের ভঙ্গিতে। দুই পায়ে খাড়া হল ক্লাউন। ডিগবাজি খেয়ে সোজা হওয়ার সময় পা দুটো সরাসরি নামিয়ে আনল গার্ডের পেটে। লাথি খেয়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হল গার্ড। ক্লাউন তারপর দ্রুত কেটে পড়ল। আনন্দ মাটি করার জন্য নাখোশ জনতা ঘিরে ধরল গার্ডকে।

এলোমেলো পদক্ষেপে দ্রুত বিচ থেকে বেরিয়ে আসছে ক্লাউন। ধাক্কা দিয়ে পথ থেকে সরিয়ে দিল অনেককে, ইতস্তত করছে, কিন্তু থামছে না। খেলা দেখার জন্য যারা ভিড় করেছিল অদৃশ্য হয়ে গেছে তারা, গার্ডও সরে পড়েছে।

“অদ্ভুত লোক”, খুশি খুশি আমেজ নিয়ে বলল বেইটা, একমত হল টোরান। পরিষ্কার চোখে পড়ার মতো কাছে চলে এসেছে ক্লাউন। চিকন মুখের সম্মুখভাগে বড় মাংসল নাক, লম্বা কৃশকায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং মাকড়সার পায়ের মতো শরীরের উপর চাপানো পোশাক সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য, চলাফেরা ধীর স্থির এবং গুরুগম্ভীর, কিন্তু মনে হয় যেন পুরো শরীর একসাথে ছুঁড়ে ফেলছে।

দেখলেই হাসি পায়।

ক্লাউন সম্ভবত বুঝতে পারল যে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ ওদেরকে পেরিয়ে গিয়েই থামল সে, ঝট করে ঘুরে এগিয়ে আসতে লাগল। তার বিশাল বাদামি চোখগুলো স্থির হয়ে আছে বেইটার উপর।

বিব্রত বোধ করল বেইটা।

হাসার ফলে ক্লাউনের চিকন মুখ আরো বিষণ্ণ হয়ে উঠল, মুখ খুলতেই বোঝা গেল যে সে সেন্ট্রাল সেক্টরের বাচনভঙ্গিতে কথা বলে।

“গুড স্পিরিটের কসম, সে বলল, “কখনো বিশ্বাস করতে পারিনি যে এত রূপসী নারী আছে-কারণ কল্পনা কখনো সত্যি হয় এটা কোনো পাগলেও চিন্তা করবে না, অথচ নিজের চোখে দেখে অবিশ্বাস করি কীভাবে, ওই মোহিনী চোখ দেখে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”

বেইটার চোখ দুটো প্রশস্ত হল। শুধু একটা বিস্ময়কর শব্দ করতে পারল সে। হাসল টোরান, “ওহে, সুন্দরী, এই ব্যাটার পাঁচ ক্রেডিট পাওনা হয়েছে। দিয়ে দাও।”

কিন্তু এক লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল ক্লাউন। “না, মাই লেডি, ভুল বুঝবেন না। আমি পয়সা চাই না, চমৎকার চোখ এবং সুন্দর মুখ দেখেই ধন্য।”

“ধন্যবাদ”, বলল বেইটা।

“শুধু মুখ আর চোখই নয়, হড়বড় করে বলে চলেছে ক্লাউন, যেন তার শব্দগুলো ক্ষিপ্রগতিতে একটা আরেকটাকে অনুসরণ করছে। “আপনার মন পরিষ্কার, দৃঢ় এবং দয়ালু।”

উঠে দাঁড়াল টোরান, চারদিন ধরে হাতে যে রোব বহন করছে গায়ে চাপালো সেটা। “ঠিক আছে, ভায়া, কী চাও আমাকে বল। ভদ্রমহিলাকে বিরক্ত করবে না।”

ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল ক্লাউন, রোগা শরীর আরো সংকুচিত হয়ে গেল। “আমি কোনো ক্ষতি করব না। আমি এখানে নতুন। সবাই বলে আমি নাকি বোকা; কিন্তু এই মহিলার মুখ দেখে বুঝতে পারছি যে কঠিন মুখের পেছনে একটা কোমল হৃদয় আছে যা আমার সমস্যার সমাধান করতে পারবে। তাই এত কথা বলছি।”

“পাঁচ ক্রেডিটে তোমার সমস্যার সমাধান হবে?” জিজ্ঞেস করল টোরান, তারপর একটা মুদ্রা বাড়িয়ে ধরল।

কিন্তু সেটা নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখা গেল না ক্লাউনের ভেতর, বেইটা বলল, “আমাকে কথা বলতে দাও, টোরি।” তারপর দ্রুত নিচু স্বরে যোগ করল, “ওর কথা শুনে বিরক্ত হওয়ার কিছু নেই, এটাই ওর কথা বলার ভঙ্গি। আমাদের কথা শুনেও সে সম্ভবত অবাক হচ্ছে।”

তারপর ক্লাউনকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার সমস্যা কী? গার্ডকে তুমি ভয় পাওনি। ওটা কোনো সমস্যা নয়, তাই না?”

“না, সে না। ওই ব্যাটা আমি হাঁটলে যে ধুলো ওড়ে তার বেশি কিছু না। আরেকজন আছে যার কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি এবং সে হচ্ছে একটা ভয়ংকর ঝড়ের মতো। তার এত ক্ষমতা যে একটা গ্রহকে উড়িয়ে নিয়ে আরেকটা গ্রহের উপর আছড়ে ফেলতে পারে। এক সপ্তাহ আগে আমি পালিয়ে এসেছি, ঘুমিয়েছি শহরের রাস্তায়, আত্মগোপন করে থেকেছি শহরের ভিড়ের মাঝে। অনেকের মুখের দিকে তাকিয়েছি সাহায্যের আশায়। সেটা পেলাম এখানে।” উদ্বিগ্ন স্বরে শেষ কথাটা আবার পুনরাবৃত্তি করল সে, বড় বড় দুটো চোখে শঙ্কা, “সেটা পেলাম এখানে।”

“দেখো”, বোঝনোর সুরে বলল বেইটা, “আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই, কিন্তু বন্ধু, একটা গ্রহ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো ঝড়ের বিরুদ্ধে আমি কিছুই করতে পারব না। সত্যি কথা বলতে কি-”

একটা বলিষ্ঠ পুরুষালী কণ্ঠের ধমক শুনে থেমে যেতে বাধ্য হল বেইটা।

“এই যে, হারামজাদা নর্দমার কীট, পেয়েছি তোকে।”

আবার সেই বিচ গার্ড, চেহারা রাগে লাল, মুখে গালিগালাজের তুবড়ি ছুটছে। দৌড়ে আসার সময় লো পাওয়ার স্টান্ট পিস্তল তুলে নির্দেশ দিল।

“আপনারা ওকে ধরে রাখুন। ছাড়বেন না।” সরু কাঁধে গার্ডের ভারী হাত পড়তেই ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল ক্লাউন।

“ও কী করেছে?” জিজ্ঞেস করল টোরান।

“কী করেছে? কী করেছে?” পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাড় মুছল গার্ড। “বলছি কী করেছে। পালিয়ে এসেছে। পুরো কালগানে প্রচার করা হয়েছে ওর পালানোর খবর। আমি আগেই চিনতে পারতাম যদি মাথায় ভর না দিয়ে দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।”

“কোত্থেকে পালিয়ে এসেছে, স্যার?” হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল বেইটা।

গলা চড়াল গার্ড। ক্রমশ ভিড় বাড়ছে। রসগোল্লার মতো বড় বড় চোখ করে একযোগে কথা বলার চেষ্টা করছে সবাই। ভিড় যত বাড়ছে গার্ডের নিজেকে জাহির করার চেষ্টাও সমান তালে বাড়ছে।

“কোত্থেকে পালিয়েছে?” মুখ ভেংচে বলল গার্ড। “আশা করি আপনারা মিউলের নাম শুনেছেন?”

ভিড়ের সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল, আর পেটের ভেতরটা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে জমে যাচ্ছে টের পেল বেইটা। ক্লাউন তার দিকেই তাকিয়ে আছে-হাত পা ছুঁড়ে চেষ্টা করছে গার্ডের বজ্রমুষ্ঠি থেকে ছাড়া পাবার।

“আর এই ব্যাটা,” গম্ভীর গলায় বলে চলেছে গার্ড, “হিজ লর্ডশিপের দরবারে একজন ভড়। সেখান থেকেই পালিয়েছে।” বন্দিকে দুহাতে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিল সে, “কিরে গর্দভ, ঠিক বলেছি না?”

জবাবে ক্লাউনের চেহারা আরেকটু ফ্যাকাশে হল, টোরানের কানে ফিস ফিস করে কিছু বলল বেইটা।

সামনে বাড়ল টোরান। “ঠিক আছে, ওর উপর থেকে হাত সরান। নাচ দেখানোর জন্য ওকে পয়সা দিয়েছি, সেটা এখনো দেখা হয়নি।”

“কী বলছেন!” ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল গার্ড। “ওকে ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার

“আপনি সেটা পাবেন, যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ওই সেই লোক। তার আগে কিছু করতে পারবেন না। আপনি একজন অতিথিকে অপমান করেছেন, সেজন্য আপনার বিপদ হতে পারে।”

“কিন্তু আপনারা হিজ লর্ডশিপের কাজে বাধা দিচ্ছেন। তারজন্য আরো বড় বিপদ হতে পারে আপনাদের।” ক্লাউনকে ধরে আরেকটা ঝাঁকুনি দিল সে। “ভদ্রলোকের পয়সা ফেরত দে, বদমাশ।”

দ্রুত হাত বাড়ালো টোরান, বেমক্কা টান পড়ায় হাত মচকে গেল গার্ডের, স্টান্ট পিস্তল পড়ে গেল। রাগ আর ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল। নির্দয়ের মতো ধাক্কা দিয়ে তাকে এক পাশে সরিয়ে দিল টোরান, ছাড়া পেয়ে তার পিছনে এসে লুকালো ক্লাউন।

পরিস্থিতির এই নতুন অগ্রগতিতে ভিড়ের প্রায় সবাই কয়েক পা পিছিয়ে গেল যেন ঝামেলা থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তারপর একটা বলিষ্ঠ আদেশ শোনা গেল। জনতা দুভাগ হয়ে মাঝখানে রাস্তা তৈরি করে দিল, এবং সেই পথে এগিয়ে আসতে দেখা গেল দুজন লোককে। হাতের ইলেকট্রনিক হুইপ বাগিয়ে রেখেছে বিপজ্জনকভাবে। ধূসর পোশাকের বুকের কাছে আড়াআড়িভাবে একটা বজ্রপাতের চিহ্ন তার নিচে ভেঙে দু টুকরা হয়ে যাওয়া একটা গ্রহের ছবি।

বিশালদেহী কালো লোকটার পরনে লেফটেন্যান্টের ইউনিফর্ম। লোকটার সব কিছু কালো, চামড়া, চুল, ভুরু।

বিপজ্জনক মসৃণ গলায় কথা বলল কালো সৈনিক, বোঝাই যায় আদেশ পালন করানোর জন্য তাকে চিৎকার করতে হয় না। “তুমি আমাদের খবর দিয়েছ?” জিজ্ঞেস করল সে। মচকানো হাত এখনো মালিশ করছে গার্ড, ব্যথায় কাতর মুখ নিয়ে বলল, “পুরস্কারটা আমার পাওনা, আর এই লোকের বিরুদ্ধে ‘

“পুরস্কার তুমি পাবে”, তার দিকে না তাকিয়েই বলল লেফটেন্যান্ট। তারপর নিজের লোকদের নির্দেশ দিল, “ওকে নিয়ে যাও।”

টোরান টের পেল তার রোবের শেষ প্রান্ত শক্ত করে টেনে ধরেছে ক্লাউন। গলা চড়াল সে, “দুঃখিত, লেফটেন্যান্ট; এই লোক আমার সাথে যাবে।”

নিরাসক্তভাবে মন্তব্যটা গ্রহণ করল সৈনিক। হুইপ তুলল একজন, কিন্তু লেফটেন্যান্টের কড়া নির্দেশ পেয়ে নামিয়ে নিল।

কালো বিশাল শরীর নিয়ে টোরানের সামনে এসে দাঁড়াল সে। “কে আপনি?” জিজ্ঞেস করল।

উত্তর এল, “ফাউণ্ডেশন-এর একজন নাগরিক।”

কাজ হল তাতে-অন্তত ভিড়ের উপর কিছুটা প্রভাব তো পড়লই। এতক্ষণের জমাট নীরবতা পরিণত হল গুনগুন ধ্বনিতে। মিউলের নাম শুনে সবাই হয়তো ভয় পেয়েছে, কিন্তু যত যাই হোক নামটা নতুন, ফাউণ্ডেশন-এর মতো ভয় জাগাতে পারে নি-যে ফাউণ্ডেশন এম্পায়ারকে পরাজিত করেছিল, আর এখন নিষ্ঠুর স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এক চতুর্থাংশ গ্যালাক্সি শাসন করছে।

লেফটেন্যান্টের চেহারা ভাবলেশহীন। সে বলল, “ওই লোকটার পরিচয় জানেন আপনি?”

“আমাকে বলা হয়েছে সে আপনাদের নেতার দরবার থেকে পালিয়ে এসেছে, কিন্তু আমি শুধু জানি সে আমার বন্ধু। ওকে নিতে হলে শক্ত প্রমাণ দেখাতে হবে।”

কর্কশ দীর্ঘ নিশ্বাস পতনের শব্দ উঠল ভিড়ের মাঝ থেকে। সেটা না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করল লেফটেন্যান্ট। “আপনি যে ফাউণ্ডেশন-এর নাগরিক সেটা প্রমাণ করার মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে?”

“আমার মহাকাশযানে আছে।”

“বুঝতে পারছেন যে আপনি বে-আইনি কাজ করছেন। একারণে আমি আপনাকে গুলি করতে পারি।”

“নিঃসন্দেহে, কিন্তু সেক্ষেত্রে ফাউণ্ডেশন-এর একজন নাগরিককে গুলি করতে হবে আপনার। তারপর আপনার দেহ টুকরো টুকরো করে কিছু অংশ ফাউণ্ডেশনে পাঠানো হবে-আংশিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে। পূর্বের ওয়ারলর্ডদের বেলায় এমন ঘটেছে।“

জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল লেফটেন্যান্ট। কারণ কথাটা সত্যি।

“আপনার নাম?” জিজ্ঞেস করল সে।

সুযোগটা কাজে লাগাল টোরান। “মহাকাশযানে গিয়ে বাকি প্রশ্নের উত্তর দেব। হ্যাঁঙ্গার থেকে সেল নাম্বার আপনি জেনে নিতে পারবেন। বেইটা’ নামে রেজিস্টার করা হয়েছে।”

“আসামিকে ফেরত দেবেন না?”

“দেব, মিউলের কাছে। আপনার মাস্টার কে পাঠান।”

ঝট করে ঘুরল লেফটেন্যান্ট। কড়া গলায় নিজের লোকদের আদেশ দিল, “ভিড় হটাও।”

ইলেকট্রিক হুইপ উপরে উঠেই নেমে এল। হুড়োহুড়ি পড়ে গেল ভিড়ের মাঝে। দ্রুত ফাঁকা হয়ে গেল জায়গাটা।

.

হ্যাঙ্গারে ফেরার পথে শুধু একবার চিন্তার রাজ্য থেকে বেরিয়ে এল টোরান। অনেকটা নিজেকে শোনানোর মতো করেই বলল, “গ্যালাক্সি, বে, কী একটা দিন গেল। প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম।”

“হ্যাঁ”, বলল বেইটা, এখনো ভয়ে গলা কাঁপছে। চোখের দৃষ্টিতে প্রশংসা। “তোমার চরিত্রের সাথে মেলে না।”

“অমি এখনো জানি না কী হয়েছে। হাতে স্টান্ট পিস্তল ছিল, সেটা কীভাবে ব্যবহার করতে হয় আমি জানি না। সেভাবেই অফিসারের সাথে কথা বললাম। কেন এরকম করলাম আমি জানি না।”

ছোট একটা স্বল্প পাল্লার এয়ার ভেসেলে করে ওরা হ্যাঁঙ্গারে ফিরছে। আইলের ওপাশের আসনগুলোর একটাতে গুঁড়িসুড়ি মেরে শুয়ে আছে মিউলের ভাঁড়। সেদিকে তাকিয়ে তিক্ত স্বরে যোগ করল সে, “এর চাইতে কঠিন কাজ আমি আগে কখনো করিনি।”

.

লেফটেন্যান্ট দাঁড়িয়ে আছে গ্যারিসনের কর্নেলের সামনে। তার দিকে তাকিয়ে কর্নেল বললেন, “চমৎকার দেখিয়েছ। তোমার কাজ শেষ।”

কিন্তু লেফটেন্যান্ট সাথে সাথেই চলে গেলনা। তিক্ত গলায় বলল, “জনতার ভিড়ের সামনে মিউলের সম্মান হানির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।”

“সেটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।” যাওয়ার জন্য ঘুরল লেফটেন্যান্ট, তারপর আবার ফিরে অনেকটা মরিয়া হয়েই বলল, “আমি একমত, যে আদেশ আদেশই। কিন্তু, ওই লোকটার স্টান্ট পিস্তলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা, এর চেয়ে কঠিন কাজ আমি আগে কখনো করিনি।”