এ স্টাডি ইন স্কারলেট by স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, chapter name প্রথম খন্ড - ৬। কেরামতি দেখাল টোবিয়াস গ্রেগসন

প্রথম খন্ড - ৬। কেরামতি দেখাল টোবিয়াস গ্রেগসন

৬। কেরামতি দেখাল টোবিয়াস গ্রেগসন

 


পরের দিন সকালে সবক-টা খবরের কাগজে ফলাও করে ছাপা হল ব্রিক্সটন মিস্ট্রির চাঞ্চল্যকর সংবাদ। লম্বা লম্বা বিবরণ ছাপল প্রত্যেকেই— কেউ কেউ সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখে ফেলল। কতকগুলো তথ্য আমার কাছেও নতুন। কেসটা সম্পর্কে অসংখ্য পেপার কাটিং এখনও রয়েছে আমার স্ক্র্যাপবুকে। কয়েকটার সংক্ষিপ্তসার নীচে তুলে দিলাম :


‘ডেলি টেলিগ্রাফ’-এর মন্তব্য অনুসারে অপরাধ ইতিহাসে কদাচিৎ এরকম বৈচিত্র্যময় ট্রাজেডি দেখা গিয়েছে। দেওয়ালের পৈশাচিক লিখন, মোটিভের অভাব এবং নিহত ব্যক্তির জার্মান নাম কিন্তু রাজনৈতিক আশ্রিত এবং বিপ্লবীদের দিকেই আঙুল দেখাচ্ছে। সমাজবাদীদের বহু শাখা আছে আমেরিকার। নিহত ব্যক্তি নিশ্চয় অলিখিত কোনো আইন ভঙ্গ করেছিল। তাই ইংল্যান্ড পর্যন্ত ধাওয়া করা হয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত বেশ উজ্জ্বলভাবে ডারউইনের থিয়োরি, ম্যালথাসের সূত্র, র‌্যাটক্লিফ রাজপথ নরহত্যার উল্লেখ করে সরকারের পিণ্ডি চটকে এবং ইংল্যান্ডে পরদেশিদের ওপর সজাগ রাখার উপদেশ দিয়ে শেষ করা হয়েছে প্রবন্ধ।


‘স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকায় একহাত নেওয়া হয়েছে উদার শাসনব্যবস্থাকে? — এর ফলেই নাকি বেড়ে ওঠে আইন ভঙ্গকারিরা। জনগণের অনিশ্চিত মানসিকতা এবং কর্তৃপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এরা মাথাচাড়া দেয়। নিহত ব্যক্তি একজন মার্কিন ভদ্রলোক! লন্ডন শহরে বাস করছিলেন বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে। ম্যাডাম চারপেনটিয়ারের একটা বোর্ডিং হাউস আছে ক্যামবারওয়েলের টর্কটেরেস অঞ্চলে। নিহত ব্যক্তি উঠেছিলেন সেখানে। পর্যটন সাথী ছিল তাঁরই সেক্রেটারি স্ট্যানজারসন। চৌঠা মঙ্গলবার বাড়িউলির কাছে বিদায় নিয়ে দু-জনেই অস্টিন স্টেশন অভিমুখে রওনা হয়েছিলেন লিভারপুল এক্সপ্রেস ধরার অভিপ্রায়ে। পরে দু-জনকেই প্ল্যাটফর্মে একত্রে দেখা গিয়েছে। এরপর থেকে মি. ড্রেবারের লাশ পাওয়া পর্যন্ত আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। লাশ পাওয়া গিয়েছে কিন্তু ব্রিক্সটল রোডের একটি শূন্যভবনে— ইউস্টন স্টেশন থেকে বহু মাইল দূরে! কীভাবে মি. ড্রেবার সেখানে পৌছেছিলেন এবং কীভাবেই-বা মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন– এখনও তা রহস্যাবৃত। স্ট্যানজারসনের গতিবিধিও রহস্যাবৃত— কোনো খবর নেই। আনন্দের কথা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মি. লেসট্রেড এবং মি. গ্রেগসন দু-জনেই এই কেসের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সুতরাং নিশ্চিতভাবে আশা করা যায়, স্বনামধন্য এই দুই অফিসারের তৎপরতায় অচিরেই রহস্যগ্রন্থি উন্মোচিত হবে এবং দুষ্কৃতকারী ধরা পড়বে।


‘ডেলি নিউজ’ পত্রিকার পর্যবেক্ষণ অনুসারে অপরাধটা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক। উদারনীতির অত্যাচারে মহাদেশীয় সরকার তাড়িত বহু ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছে আমাদের ভূমিতে— স্বৈরতন্ত্র আর ঘৃণার স্মৃতি ভুলতে পারলে আদর্শ নাগরিক হতে পারত এরা প্রত্যেকেই। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার অধীন এরা— এতটুকু লঙ্ঘন ঘটলেই শাস্তি মৃত্যু। সেক্রেটারি স্টারজারসনকে যেভাবেই হোক খুঁজে বার করা দরকার। নিহত ব্যক্তির বিশেষ কী কী অভ্যেস ছিল, সে-সম্বন্ধেও তদন্ত করা প্রয়োজন। বোর্ডিং হাউসের ঠিকানা পাওয়ার কাজ অনেক এগিয়েছে। বিরাট এই আবিষ্কারের সমস্ত কৃতিত্বই প্রাপ্য অবশ্য স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মি: গ্রেগসনের। তার উদ্যম আর অধ্যবসায়ের ফলেই নিহত ব্যক্তির সাময়িক আস্তানার হদিশ মিলেছে।


প্রাতরাশ খেতে খেতে আমি আর শার্লক হোমস একত্রে পড়লাম খবরগুলো। দেখলাম, সন্দেশ বৈচিত্র্যে বেশ মজা পেয়েছে বন্ধুবর।


বলিনি তোমাকে, যাই ঘটুক না কেন লেসট্রেড আর গ্রেগসন বাহবা লুটে বেরিয়ে যাবে।


কেস কী দাঁড়ায় দ্যাখ, কে কত বাহবা লোটে কখন দেখা যাবে।


তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। কিন্তু তাতেও কিছু হবে না। খুনি ধরা পড়লেও ওরা বাহবা পাবে, না-পড়লেও পাবে। ধরা যদি পড়ে সবাই বলবে ওদের খাটনির জন্যেই তা হয়েছে। না-পড়লে বলবে, খাটনি সত্ত্বেও খুনি পগার পার হয়েছে। টস করার মতো আর কি! এ-পিঠ পড়লে আমার লাভ, ও-পিঠ পড়লে তোমার হার।


এ আবার কী! চমকে উঠলাম। হল ঘরে আর সিঁড়ির ওপর অকস্মাৎ অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ। সেইসঙ্গে তারস্বরে বিরক্তি ঘোষণা করছেন বাড়িউলি।

ডিটেকটিভ পুলিশ ফোর্সের বেকার স্ট্রিট বাহিনী আসছে, গম্ভীরভাবে বললে বন্ধুবর এবং কথার মাঝেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল আধ ডজন নোংরা রাস্তার ছেলে। জীবনে এ-রকম ছেড়া জামাকাপড় পরা আর এত নোংরা মায়ে-খেদানো বাপে-তাড়ানো রাস্তার ছেলে দেখিনি।


‘অ্যাটেনশন!’ তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল হোমস! তৎক্ষণাৎ ছ-টা কাদামাখা স্কাউন্ডেল সারি দিয়ে সামরিক কায়দায় দাঁড়িয়ে গেল আধ ডজন ভাঙাচোরা কদৰ্য পাথরের মূর্তির মতো। এরপর থেকে— শুধু উইগিন্সকে পাঠাবি খবর দিতে— বাদবাকি দাঁড়াবি রাস্তায়। উইগিন্স, পেয়েছিস?


একটা উঞ্ছ বলে, আজ্ঞে না, পেলাম না।


জানতাম পাবি না। না-পাওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যা। এই নে তোদের রোজ। প্রত্যেকের হাতে একটা শিলিং দিয়ে– যা এবার বেরো। এর পরের বার আরও ভালো খবর নিয়ে তবে আসবি।


হাত নাড়তেই একপাল ধেঁড়ে ইঁদুরের মতো খসখস মড়মড় দুমদাম শব্দে ছোড়াগুলো নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। পরমুহুর্তে রাস্তা থেকে ভেসে এল সরু তীক্ষ্ণ কচি গলার চিৎকার।


হোমস বললে, এক ডজন পুলিশ চর যা না-পারে, এদের একজন তা পারে। পুলিশি চেহারা দেখলেই মুখে চাবি দেয় প্রত্যেকেই। কিন্তু এরা সর্বত্র যায়, সবার কথা শোনে। ছুঁচের মতো তীক্ষ্ণ প্রত্যেকেই— শুধু দরকার সংগঠনের।


ব্রিক্সটন কেসে এদের লাগিয়েছ বুঝি?


হ্যাঁ। একটা ব্যাপার আমি যাচাই করতে চাই। একটু যা সময় লাগবে। আরে! আরে! এবার কিন্তু আরও খবর আসছে— সেইসঙ্গে লাঞ্ছনা! গ্রেগসন আসছে! রাস্তা দিয়ে হাঁটছে দেখ! স্বৰ্গসুখ যেন উথলে উঠছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত! নিশ্চয় আমাদের কাছেই আসছে। ঠিক ধরেছি! ওই দ্যাখো দাঁড়িয়ে গেল। ওই আসছে!’


বিষম শব্দে বেজে উঠল দরজার ঘণ্টা। পরমুহুর্তেই এক এক লাফে তিনটে করে ধাপ টপকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে উল্কার মতো বসবার ঘরে ঢুকে পড়ল সাদা চুলো ডিটেকটিভ। উষ্ণ অভ্যর্থনার ধার দিয়ে গেল না হোমস। গ্রেগসন কিন্তু ওর নিঃসাড় হাতখানা খপ করে তুলে নিয়ে করমর্দন করতে করতে বললে সোল্লাসে, মাই ডিয়ার মি. হোমস, অভিনন্দন জানান! পুরো ব্যাপারটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার করে এনেছি!


হোমসের ভাবসমৃদ্ধ মুখের ওপর দিয়ে চকিতে ভেসে গেল উদবেগের কালোছায়া। বললে, ঠিক লাইন ধরে ফেলেছ?


ঠিক লাইন কী বলছেন। আরে মশাই, খুনিকে হাজতে পুরে এসেছি।


নাম কী তার?


আর্থার চারপেনটিয়ার। নৌবাহিনীর সাব লেফটেন্যান্ট। মোটা মোটা দু-হাত ঘষে আর বুক ফুলিয়ে আত্মম্ভরিতায় যেন ফেটে পড়ল গ্রেগসন! স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল শার্লক হোমস। ‘বোসো। নাও, এই চুরুটটা টেনে দেখতে পার। কীভাবে জাল গুটিয়ে আনলে শুনতে ইচ্ছে যাচ্ছে। হুইস্কি আর জল চলবে?


আপত্তি নেই। দিন দুয়েক প্রচণ্ড ধকল গেছে— হুইস্কির দরকার হয়েছে বই কী। শারীরিক নয়, মানসিক। টানাপোড়েনে শেষ করে এসেছি। মি. শার্লক হোমস, এ-খাটনি যে কী জিনিস তা আপনি বুঝবেন, কেননা আপনি আমি দু-জনেই মগজ খাটিয়ে খাচ্ছি!


খুব বেশি সম্মান দিয়ে ফেললে আমাকে, গম্ভীরভাবে বললে হোমস। এখন বল অতীব সন্তোষজনক এহেন সমাপ্তি সম্ভব হল কীভাবে।


আর্মচেয়ারে বসল ডিটেকটিভ। নির্লিপ্তভাবে সুখটান দিল চুরুট। আচমকা বিষম কৌতুকে যেন ফেটে পড়ল সশব্দে উরুতে চপেটাঘাত করে।


বললে সোল্লাসে, মজাটা কি জানেন? হাঁদারাম লেসট্রেড নিজেকে বড্ড বেশি চালাকচতুর মনে করে তো, তাই গোড়া থেকেই ছুটেছে ভুল পথে। ও দৌড়েছে সেক্রেটারি স্ট্যানজারসনকে পাকড়াও করতে, অথচ সে-লোকটা মায়ের পেটের বাচ্চার মতোই অমলিন, নির্দোষ। এতক্ষণে বোধ হয় তাকে গ্রেপ্তারও করে ফেলেছে।


দৃশ্যটা কল্পনা করে এত সুড়সুড়ি অনুভব করলে গ্রেগসন যে বিষম না-খাওয়া পর্যন্ত হেসেই চলল আপন মনে।


তোমার সূত্র পেলে কীভাবে বল?


বলব, বলব, আপনাকে সব বলব। ডক্টর ওয়াটসন, এসব কথা কিন্তু এই ক-জনের মধ্যেই সীমিত থাকবে। প্রথম সমস্যাটা হল গিয়ে আমেরিকান ভদ্রলোকের পূর্ব পরিচয়। আর কেউ হলে বিজ্ঞাপনের জবাব আসার অপেক্ষায় অথবা স্বেচ্ছায় কারো বলে যাওয়ার পথ চেয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকত। কিন্তু টোবিয়াস গ্রেগসনের কাজের ধারাই আলাদা। মনে আছে মৃত ব্যক্তির পাশে একটা টুপি পড়ে ছিল?


হ্যাঁ মনে আছে। ১২৯ নম্বর ক্যাম্বারওয়েল রোডের জন আন্ডারউড অ্যান্ড সন্স কোম্পানির তৈরি টুপি। বললে হোমস।


চোয়াল ঝুলে পড়ল গ্রেগসনের।


আপনিও যে লক্ষ করেছেন জানতাম না। গেছিলেন নাকি ওখানে।


না।


হা! হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন গ্রেগসন। সুযোগ যত ক্ষুদ্রই মনে হোক না কেন, কখনো তা পায়ে ঠেলবেন না।


বৃহৎ মনের কাছে ক্ষুদ্র বলে কিছুই নেই, অর্থপূর্ণ ভাবে বললে হোমস। যাই হোক, আন্ডারউডে গিয়েছিলাম আমি। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম এই মাপের এই চেহারার টুপি কাউকে বিক্রি করেছে কিনা। খাতাপত্র দেখে তৎক্ষণাৎ বলে দিল নাম আর ঠিকানা। টুপিখানা পাঠিয়েছিল টর্ক টেরেসের চাপেন্টিয়ার বোর্ডিং নিবাসী মি. ড্রেবারের কাছে। এইভাবেই পেলাম ঠিকানা।


স্মাট— অত্যন্ত স্মার্ট! বিড়বিড় করে বললে শার্লক হোমস।


এরপর দেখা করলাম ম্যাডাম চাপেন্টিয়ারের সঙ্গে। দেখলাম মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গিয়েছে ভদ্রমহিলাও— খুব বিমর্ষ আর উদবিগ্ন। ভদ্রমহিলার মেয়েও ছিল ঘরের মধ্যে। ভারি চমৎকার মেয়ে— এক কথায় অসাধারণ! চোখ লাল। আমার কথা শুনে জবাব দিতে গিয়ে ঠোঁট কাপতে লাগল। কিছুই নজর এড়াল না আমার। এ-অনুভূতি আপনি বুঝবেন মি. শার্লক হোমস। ঠিক গন্ধটি পেলে কীরকম একটা রোমাঞ্চ জাগে স্নায়ুর মধ্যে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের ভূতপূর্ব বোর্ডার ক্লিভল্যান্ড নিবাসী মি. এনক জে ড্রেবারের রহস্যজনক মৃত্যুব খবর পেয়েছেন?


মা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন বটে, কিন্তু কথা বলতে পারলেন না। হু-হু করে কেঁদে ফেলল মেয়েটা। বুঝলাম এরা দুজনেই এ-ব্যাপারের অনেক কিছু জানে।


জিজ্ঞেস করলাম, ট্রেন ধরবার জন্যে ক-টার সময়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলেন মি. ড্রেবার?


‘আটটায়’, উদগত উত্তেজনাকে হাত দিয়ে গলায় ধরে বললে মেয়েটা। দুটো ট্রেন ছিল— বললেন ওঁর সেক্রেটারি মি. স্ট্যানজারসন। সোয়া ন-টায় আর এগারোটায়! উনি প্রথম ট্রেনটা ধরতে চেয়েছিলেন।


তারপর আর ওঁকে দেখেননি?


প্রশ্ন শুনেই ভয়ংকর পরিবর্তন লক্ষ করলাম ভদ্রমহিলার চোখে-মুখে। লাল হয়ে গেলেন।


‘না’ শব্দটুকু উচ্চারণ করতেই সময় নিলেন অনেকক্ষণ— তা-ও অস্বাভাবিক চাপা সুরে। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর শান্ত গলায় বললে মেয়ে, মিথ্যে বলে লাভ নেই মা, একে সব খুলেই বলাই দরকার! হ্যাঁ, মি.  ড্রেবারকে আবার দেখেছিলাম আমরা।


একী সর্বনাশ করলি। কঁকিয়ে উঠলেন ম্যাডাম চাপেন্টিয়ার, দু-হাত শূন্যে ছুড়ে এলিয়ে পড়লেন, চোয়াড়ে দাদাকে খুন করলি শেষকালে।


সত্যি না-বললে বরং আর্থারই খুন করত সবাইকে। দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিল মেয়ে।


আমি বললাম, খুলে বলুন। পেটে অর্ধেক মুখে অর্ধেক আরও খারাপ। তা ছাড়া, আপনারা যে কতটা জানেন তাও তো জানেন না!


অ্যালিস, তোর জন্যেই এই সর্বনাশ হল! শিউরে উঠলেন মা। তারপরেই ফিরলেন আমার দিকে। বললেন, ঠিক আছে, আমিই সব বলছি; ভাববেন না যেন ছেলে এই সাংঘাতিক ব্যাপারে জড়িয়ে আছে বলে ভয়ের চোটে বলছি। সে নির্দোষ— একেবারেই। আমার ভয় কেবল আপনাদের চোখকে আর আইনের চোখকে— ও-চোখে হয়তো বেচারা দোষী সাব্যস্ত হয়ে যেতে পারে। অবশ্য তা অসম্ভব। ওর পূর্ব পরিচয়, ওর পেশা, ওর চরিত্রে এ-কাজ সম্ভব নয়।


খুলে বলুন, কিছু লুকোবেন না। যদি সে নিরপরাধ হয়, আমার ওপর ভরসা রাখুন। বললাম আমি।


অ্যালিস, তুই বাইরে যা, মায়ের হুকুমে বেরিয়ে গেল মেয়ে।


মেয়ে বেফাঁস কথা না-বলে বসলে কিছুই বলতাম না। কিন্তু বলব বলে যখন ঠিক করেছি, কিছুই বাদ দেব না— সব বলব।


সোজা পথ কিন্তু সেইটাই, বললাম আমি। ‘হপ্তা তিনেক হল মি. ড্রেবার ছিলেন আমাদের সঙ্গে। মহাদেশ পর্যটনে বেরিয়েছেন দু-জনে— উনি আর সেক্রেটারি মি. স্ট্যানজারসন। ওঁদের দু-জনেরই ট্রাঙ্কে কোপেনহেগেন লেখা লেবেল দেখেছি। অর্থাৎ দু-জনেই লন্ডন আসার আগে কোপেনহেগেনে ছিলেন। স্ট্যানজারসন লোকটা অল্পভাষী, সংযত, শান্ত। কিন্তু তার অন্নদাতাটি ঠিক উলটো। হাবভাব চাষাড়ে, কথাবার্তা পাশবিক। সূক্ষ্মতার বালাই নেই– সবই স্থল। যেদিন এলেন সেই রাতেই বেহেড মাতাল হলেন আকণ্ঠ মদ গিলে— পরের দিন বারোটার মধ্যেই আর মানুষ পদবাচ্য রইলেন না। পরিচারিকাদের সঙ্গে দহরম-মহরম যদি দেখতেন! সবচেয়ে বিশ্রী হল ভদ্রলোক দু-দিনেই ঠিক একই ব্যবহার শুরু করলেন আমার মেয়ে অ্যালিসের সঙ্গে এবং একাধিকবার এমন সব কথা বলে বসলেন সৌভাগ্যক্রমে যার মানে বোঝার বয়স এখনও আমার মেয়ের হয়নি। একবার তো হাত ধরে অ্যালিসকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়েও ধরেছিলেন। সেক্রেটারি এই নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট বকাঝকা করেছিল অন্নদাতাকে। এ কী বর্বরতা!


আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, সহ্য করলেন কেন! পছন্দ না-হলে বোর্ডারকে বিদেয় করার অধিকার নিশ্চয় আপনার আছে?


মোক্ষম প্রশ্ন শুনে মুখ লাল করে ফেললেন মিসেস চারপেন্টিয়ার। বললেন, যেদিন এসেছিলেন সেদিনই বিদায় করা উচিত ছিল। কিন্তু কী জানেন, পারিনি শুধু একটা প্রলোভনের জন্যে। মাথাপিছু এক এক পাউন্ড প্রতিদিন— সাত দিনে চোদ্দো পাউন্ড। বছরের এ সময়ে বোর্ডিং হাউস ফাঁকা যায়— চোদ্দো পাউন্ড তাই কম কথা নয়। আমি বিধবা মানুষ, এক ছেলেকে নৌবাহিনীতে ঢোকাতে গিয়ে দেউলে হতে বসেছি। তাই অতগুলো টাকা ছাড়তে পারিনি। সব সহ্য করে যাচ্ছিলাম— শেষেরটা বাদে। নোটিশ দিলাম। বলে দিলাম অমন অসভ্য বোর্ডার দরকার নেই। ওঁরা বিদেয় হয়েছিলেন এইজন্যেই।


তারপর?


গাড়ি হাঁকিয়ে সত্যি সত্যিই বিদেয় হতে মনটা বেশ হালকা হয়ে গেল। ছেলে এখন ছুটিতে রয়েছে। এসব কথা ওর কানে তুলিনি ওর বদমেজাজের জন্যে— তার ওপরে বোন-অন্ত প্রাণ। তাই মি. ড্রেবারকে বিদেয় করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু কী কপাল দেখুন, এক ঘণ্টা যেতে-না-যেতে ফের বেজে উঠল ঘণ্টা— খবর এল ড্রেবার ফিরে এসেছেন। ভীষণ উত্তেজিত এবং চুরচুরে মাতাল অবস্থায়। মেয়েকে নিয়ে যে-ঘরে বসেছিলাম, জোর করে ঢুকে পড়লেন সে-ঘরে। ট্রেন ফেল করার অজুহাতস্বরূপ অসংলগ্নভাবে অনেক কথা বলবার পর ঘুরে দাঁড়ালেন অ্যালিসের দিকে। আমার সামনেই প্রস্তাব করলেন অ্যালিসকে— সেই মুহুর্তে যেন তার সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে পালায়। বললেন, তুমি এখন প্রাপ্তবয়স্কা— তোমাকে আটকে রাখার আইন দেশে নেই। আমার অনেক টাকা— খরচ করতে চাই। এ-বুড়িটার কথা ভেবো না। বেরিয়ে এসো আমার সঙ্গে! রানি বানিয়ে রাখব তোমাকে। ভীষণ ভয়ে কুঁকড়ে সরে যেতে চাইল অ্যালিস বেচারা, কিন্তু মি. ড্রেবার ওর হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে চললেন দরজার দিকে। গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। ঠিক সেই মুহুর্তে ঘরে ঢুকল আমার ছেলে আর্থার। তারপর কী হয়েছে জানি না। গালিগালাজ আর ধস্তাধস্তির আওয়াজটুকু কেবল মনে আছে। আতঙ্কে কাঠ হয়ে গিয়ে মাথা পর্যন্ত তুলতে পারিনি। তোলবার পর দেখলাম দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে আর্থার— হাতে একটা লাঠি। বললে, এ-পথ আর মাড়াবে বলে মনে হয় না। তবুও পেছন পেছন গিয়ে দেখে আসা যাক শেষটা। টুপি নিয়ে রাস্তায় নেমে গেল আর্থার। পরের দিন সকালে মি. ড্রেবারের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর শুনলাম।


অনেক খাবি খেয়ে অনেকবার থেমে নিজের মুখে বিবৃতিটা দিলেন মিসেস চাপেন্টিয়ার। মাঝে মাঝে গলার স্বর এমন থেমে গেল যে স্পষ্টভাবে শব্দগুলো শুনতে পেলাম না। পাছে ভুল হয়, তাই প্রত্যেকটা কথা শর্টহ্যান্ডে লিখে নিলাম আমার নোটবইতে।


হাই তুলে শার্লক হোমস বলল, খুব উত্তেজক বিবৃতি। তারপর কী হল বল।


মিসেস চাপেন্টিয়ারের সব কথা শোনবার পর দেখলাম পুরো কেসটাই নির্ভর করছে একটা পয়েন্টের ওপর। বিশেষ এক কায়দায় মেয়েদের দিকে চেয়ে জেরা করে অনেকবার সুফল পেয়েছি আমি। মিসেস চাপেন্টিয়ারের দিকে সেভাবে চেয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলাম, তার ছেলে বাড়ি ফিরেছিল কখন।


জানি না, বললেন ভদ্রমহিলা।


জানেন না?


না; ওর কাছে ল্যাচের চাবি থাকে। নিজেই বাড়ি ফিরেছিল।


আপনি শুয়ে পড়ার পর?


হ্যাঁ।


কখন শুয়েছিলেন আপনি?


এগারোটা নাগাদ।


আপনার ছেলে তাহলে কমসেকম দু-ঘণ্টা বাইরে ছিল?


হাঁ!


চার পাঁচ ঘণ্টাও হতে পারে।


তা পারে।


কী করছিল অতক্ষণ?


জানি না, বলতে বলতে ঠোঁট সাদা হয়ে গেল ভদ্রমহিলার।


এরপর আর কিছু করার ছিল না। লেফটেন্যান্ট চাপেন্টিয়ার কোথায় আছে জেনে নিয়ে দু-জন অফিসারের সঙ্গে সেখানে গিয়ে গ্রেপ্তার করলাম তাকে। কাঁধে হাত দিয়ে যেই বলেছি চেঁচামেচি না-করে চুপচাপ সঙ্গে আসতে, অমনি বুক ফুলিয়ে তেজ দেখিয়ে বললে— স্কাউন্ড্রেল ড্রেবারের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে নিশ্চয় গ্রেপ্তার করছেন? কী জন্যে গ্রেপ্তার করছি কিছুই বলিনি। তা সত্ত্বেও নিজে থেকেই প্রসঙ্গটা উল্লেখ করা খুবই সন্দেহজনক।


খুবই, বললে হোমস।


লাঠিটা সঙ্গেই ছিল। ভারী লাঠি। ড্রেবারের পেছন পেছন যাওয়ার সময়ে নিয়ে বেরিয়েছিল— মা নিজে বলেছেন। বেশ মোটা ওক কাঠের মুগুর!


ব্রিক্সটন রোড পর্যন্ত পেছন পেছন গিয়েছিল। ড্রেবারের সঙ্গে আর একদফা কথা কাটাকাটি হয় সেখানে! আর্থার মুগুর দিয়ে মরণ মার মারে তলপেটে— এক মারেই অক্কা পান ড্রেবার— ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়নি সেই কারণেই। বৃষ্টি পড়ছে তখন। রাস্তা ফাঁকা। লাশ টেনে নিয়ে একটা ফাঁকা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল চাপেন্টিয়ার। মোমবাতি, রক্ত, দেওয়ালে লেখা আর আংটি হল পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা— তদন্ত যাতে অন্য খাতে বয়ে যায়।


শাবাশ! পিঠ চাপড়ানো স্বরে বললে হোমস। ‘সত্যিই গ্রেগসন, তোমাকে আর আটকানো গেল না। আরে যশের মুকুট তোমার কপালেই নাচছে!


বুক ফুলিয়ে গর্বিত স্বরে বললে ডিটেকটিভ, নিজের মুখে বললে তো অহংকার শোনায়, কিন্তু ব্যাপারটা কী চমৎকার গুছিয়ে ফেলেছি দেখুন। আর্থার চাপেন্টিয়ার একটা জবানবন্দি দিয়েছে স্বেচ্ছায়। বলেছে, ড্রেবারকে কিছুদূর ফলো করার পর ভয়ের চোটে লোকটা একটা ঘোড়ার গাড়ি চেপে পালিয়ে যায়। বাড়ি ফেরার পথে একজন পুরানো জাহাজি দোস্তের সঙ্গে দেখা হয় আর্থারের— হাঁটতে হাঁটতে দুই বন্ধু চলে যায় অনেক দূর। বন্ধুটি কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করে কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পাইনি। কেসটা মিটে এসেছে বলেই আমার বিশ্বাস— গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত সবক-টা খাপছাড়া ব্যাপারই দেখুন কী সুন্দর খাপে খাপে বসে গিয়েছে— ফাঁক নেই কোথাও। লেসট্রেড বেচারির কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে। ভুল সূত্র নিয়ে দৌড়ে মরছে। কাদা ঘাটাই সার হবে। আরে, বলতেই এসে গেছে লেসট্রেড।


লেসট্রেডই বটে। আমরা যখন কথায় মগ্ন ও তখন সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছে। এখন ঢুকল ঘরে। ওর হাবভাব পোশাক পরিচ্ছদে সব সময়ে আত্মবিশ্বাস আর ফুর্তিবাজ মেজাজ লেগে থাকে— এখন তা নেই। মুখভাব বিচলিত, ক্লিষ্ট; পোশাক অবিন্যস্ত, অপরিচ্ছন্ন। এসেছিল নিশ্চয় শার্লক হোমসের সঙ্গে শলাপরামর্শ করার জন্যে, তাই সতীর্থকে আগেই সেখানে হাজির দেখে বিব্রত হল খুবই— চুপসে গেল ফুটো বেলুনের মতো। ঘরের ঠিক মাঝখানে নার্ভাসভাবে টুপিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনিশ্চিতভাবে— কী যে করা উচিত যেন ঠিক করে উঠতে পারছে না। শেষকালে আর থাকতে না-পেরে বললে, ভারি গোলমেলে কেস— অত্যন্ত অসাধারণ, অত্যন্ত দুর্বোধ্য।


বিজয় গৌরবে ফেটে পড়ল গ্রেগসন, এতক্ষণে তা বুঝলেন! আমি অবশ্য আগেই জানতাম এ-সিদ্ধান্তে আপনাকে আসতেই হবে। সেক্রেটারি মি. জোসেফ স্ট্যানজারসনকে খাঁচায় পুরতে পারলেন কি?


গম্ভীরভাবে বললে লেসট্রেড,‘আজ ভোর ছ-টায় হ্যালিডেজ প্রাইভেট হোটেলে খুন হয়েছে সেক্রেটারি, মি. জোসেফ স্ট্যানজারসন।